নিজস্ব প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক ||
‘দুই লোকমা খেয়ে নাও, তারপর ফোন দেব’, ‘পড়া শেষ করলে আধঘণ্টা ইউটিউব দেখতে দেব’ কিংবা ‘কান্না থামালে গেম খেলতে দেব’—আজকাল প্রায় প্রতিটি পরিবারেই এমন দৃশ্য কমবেশি পরিচিত। শিশুকে শান্ত রাখা, খাওয়ানো কিংবা পড়তে বসানোর সহজ উপায় হিসেবে অনেক অভিভাবক অজান্তেই মোবাইল, ইউটিউব কিংবা গেমকে ব্যবহার করছেন শর্ত ও পুরস্কারের হাতিয়ার হিসেবে।
ক্ষণিকের জন্য এটি হয়তো বেশ কার্যকর মনে হয়। কিন্তু প্রতিদিনের এই অভ্যাসই ধীরে ধীরে শিশুর মানসিকতা, আচরণ ও সামাজিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, শিশুকে সামলানোর স্বাভাবিক দায়িত্বের সঙ্গে যখন স্ক্রিন টাইমকে পুরস্কার হিসেবে যুক্ত করা হয়, তখন তার মনে একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়—‘কোনো কাজ করতে হলে বিনিময়ে আমাকে স্ক্রিন দিতে হবে।’
এভাবে খাবার খাওয়া, পড়াশোনা করা কিংবা কান্না থামানোর মতো স্বাভাবিক আচরণের সঙ্গেও মোবাইলের সম্পর্ক তৈরি হয়। একপর্যায়ে শিশু মোবাইল বা স্ক্রিন ছাড়া কোনো কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করতে পারে। পড়াশোনার মতো মনোযোগ ও ধৈর্যের প্রয়োজন এমন কাজেও তখন বাহ্যিক পুরস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়। এতে শিশুর স্বাভাবিক শেখার আগ্রহ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
অভিভাবকদের করণীয়:
শর্তহীন পারিবারিক নিয়ম গড়ে তুলুন
খাবারের সময়, ঘুমের সময় এবং পড়াশোনার সময়কে ‘ডিভাইস-মুক্ত সময়’ হিসেবে নির্ধারণ করা যেতে পারে। পড়াশোনা বা খাবারের বিনিময়ে মোবাইল দেওয়ার অভ্যাস থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে হবে।
নিজে উদাহরণ তৈরি করুন:
শিশুরা বড়দের অনুকরণ করে শেখে। তাই খাবারের টেবিলে, শিশুর সঙ্গে কথা বলার সময় কিংবা পারিবারিক সময় কাটানোর সময় অভিভাবকদেরও অপ্রয়োজনে ফোন ব্যবহার এড়িয়ে চলা উচিত।
বিকল্প আনন্দের ব্যবস্থা করুন:
শিশুকে শান্ত করতে সবসময় কার্টুন, ভিডিও বা গেমের ওপর নির্ভর না করে গল্প বলা, ছবি আঁকা, বই পড়া, ধাঁধা, পাজল, খেলনা কিংবা ঘরের ভেতর-বাইরের বিভিন্ন সৃজনশীল খেলায় উৎসাহিত করা যেতে পারে।
জেদ বা কান্নায় ধৈর্য ধরুন:
শিশু কান্না করলে বা জেদ করলে সঙ্গে সঙ্গে হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া সহজ সমাধান মনে হতে পারে। কিন্তু এর বদলে তার অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা, কথা শোনা এবং শান্তভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
যা এড়িয়ে চলা জরুরি:
‘পড়লে ফোন পাবি’—এ ধরনের চুক্তি নয়
পড়াশোনা, খাবার খাওয়া বা অন্য স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে নিয়মিত স্ক্রিন টাইম দেওয়ার প্রতিশ্রুতি শিশুর মধ্যে ভুল প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে।
কান্না থামাতে মোবাইল নয়:
শিশু কাঁদলেই বা বায়না ধরলেই দ্রুত মোবাইল ধরিয়ে দেওয়া উচিত নয়। এতে সে ধীরে ধীরে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণের বদলে স্ক্রিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে।
নিজের সুবিধার জন্য শিশুকে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে একা রাখা নয় ঘরের কাজ কিংবা ব্যক্তিগত ব্যস্ততার সময় শিশুকে দীর্ঘক্ষণ মোবাইল বা ইউটিউবের সামনে বসিয়ে রাখা অভ্যাসে পরিণত করা ঠিক নয়। শিশুর সঙ্গে কথা বলা, সময় কাটানো ও খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
প্রযুক্তি আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিশুর শেখা ও বিনোদনের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার হতে পারে। তবে প্রযুক্তি যেন কখনো শিশু লালন-পালনের বিকল্প কিংবা অভিভাবক-শিশুর দরকষাকষির হাতিয়ার হয়ে না ওঠে, সেদিকে সচেতন থাকতে হবে।
শিশুর কান্না থামাতে মোবাইল নয়, প্রয়োজন মনোযোগ; পড়াশোনায় বসাতে প্রলোভন নয়, প্রয়োজন উৎসাহ; আর শিশুকে সঠিক পথে গড়ে তুলতে শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন সময়, ভালোবাসা, ধৈর্য ও দায়িত্বশীল অভিভাবকত্ব।
আজকের শিশুই আগামী দিনের সমাজ। তাই একটি সুস্থ, আত্মনির্ভরশীল ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে মোবাইলের সহজ সমাধানের বদলে সচেতন অভিভাবকত্বকেই বেছে নিতে হবে।
লেখক: জাকির আহমদ খান কামাল
অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক