নিজস্ব প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক ||
আইন ও বিধিবিধান থাকলেও কার্যকর প্রয়োগের অভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ সুদের কারবার বন্ধ হচ্ছে না—এমন অভিযোগ রয়েছে। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে দরিদ্র, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্নআয়ের মানুষ একসময় পড়ছেন ঋণের গভীর ফাঁদে। সুদসহ টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে অনেককে জমি, বসতভিটা কিংবা অন্যান্য সম্পদ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি অসচ্ছল মানুষের আর্থিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চড়া সুদে টাকা দেন। নির্ধারিত সময়ে টাকা পরিশোধ করতে না পারলে ভুক্তভোগীদের নানাভাবে চাপ ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে অনেক ভুক্তভোগীও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পান না।
এমনই একটি অভিযোগ উঠেছে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার সদর দিঘলিয়া ইউনিয়নের পানিগাতী গ্রামের টুটুল খানের বিরুদ্ধে। তিনি বক্কার খানের ছেলে। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, টুটুল খান দীর্ঘদিন ধরে সুদে টাকা দেওয়ার কারবারের সঙ্গে জড়িত। তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে পরে সুদসহ তা পরিশোধ করতে গিয়ে কয়েকজন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে পানিগাতী গ্রামের মো. আলী খানের ছেলে সোহাগ খান আর্থিক সংকটে পড়লে পরিবারের অজ্ঞাতে টুটুল খানের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেন। পরবর্তীতে টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া হলে বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সালিশ বৈঠক হয়।
সালিশের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সোহাগের স্ত্রী কষ্ট করে ৫০ হাজার টাকা জোগাড় করে মূল টাকা পরিশোধ করেন বলে জানা গেছে। এরপর টুটুল খান আরও ৩০ হাজার টাকা সুদ দাবি করেন বলে অভিযোগ। তবে সোহাগের স্ত্রী ওই টাকা দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় তা পরিশোধে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং সুদের টাকা মওকুফের অনুরোধ জানান।
পরবর্তীতে পাওনা টাকা আদায়ের জন্য টুটুল খান আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। তবে তার সুদে টাকা দেওয়ার কারবারের কোনো বৈধ লাইসেন্স ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পরে তিনি দিঘলিয়া ইউনিয়নের গ্রাম আদালতে সোহাগ খানের বিরুদ্ধে মামলা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ওই মামলার পর সোহাগ খানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। তবে গ্রাম আদালতের এখতিয়ার, মামলার প্রকৃতি এবং জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানাটি আইনগতভাবে যথাযথ কি না—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পানিগাতীসহ আশপাশের এলাকায় আরও কয়েকজন ব্যক্তি এ ধরনের সুদের কারবারের সঙ্গে জড়িত। তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং কেউ কেউ কারাভোগও করেছেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। আবার অনেকে হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির ভয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সচেতন মহল বলছে, অবৈধ সুদের কারবার বন্ধে শুধু আইন থাকলেই হবে না, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুযোগ বাড়ানো, আর্থিক সচেতনতা তৈরি এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা জরুরি।
তাদের মতে, সুদের কারবার বৈধ না অবৈধ—এটি নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে মামলা হলে সেই মামলার আইনগত ভিত্তি, আদালতের এখতিয়ার এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির প্রক্রিয়াও খতিয়ে দেখা দরকার।
পানিগাতী গ্রামের টুটুল খানের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে অবৈধ সুদের কারবারের বিস্তার রোধে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।