নিজস্ব প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক ||
অপরাধমুক্ত ও নিরাপদ সমাজ গঠনে ক্রাইম রিপোর্টারদের বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধ দমন ও নিরাপদ সমাজ গঠনে অনুসন্ধানী সাংবাদিক তথা ক্রাইম রিপোর্টারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের সঙ্গে অপরাধের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে অপরাধ এখন ক্রমেই আধুনিক ও ডিজিটাল রূপ নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে অপরাধ প্রতিরোধে আধুনিক আইনি কাঠামোর পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল এবং বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা অপরিহার্য।
তিনি বলেন, অপরাধ, অপরাধী, অপরাধবিজ্ঞান, পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—সবগুলো বিষয় পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তথ্য প্রদান এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্র্যাবের মতো ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ৩১৮ জন পেশাদার সদস্য নিয়ে ৪৩ বছরের পথচলায় ক্র্যাব অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা একটি জ্ঞানভিত্তিক ও উচ্চমানের সাংবাদিকতার শাখা। এ ধরনের সাংবাদিকতার জন্য গভীর পড়াশোনা, তথ্য সংগ্রহ এবং সঠিকভাবে তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা প্রয়োজন।
অপরাধের মূল কারণ খুঁজে বের করার তাগিদ
অপরাধের মূল কারণ অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্বারোপ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধ কেবল একটি বাহ্যিক উপসর্গ। এর পেছনের মূল কারণ খুঁজে বের করে গোড়ায় আঘাত করতে হবে।
তিনি বলেন, সমাজে সংঘটিত বিভিন্ন ঘৃণ্য ও চাঞ্চল্যকর অপরাধ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই মাদক ও জুয়া অপরাধের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। তাই শুধু অপরাধীকে শাস্তি দিলেই হবে না, কেন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে—সমাজকে তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। অপরাধের উৎসমুখে কার্যকর সমাধান করা গেলে সমাজে অপরাধের হার কমিয়ে আনা সম্ভব।
আহত সাংবাদিকদের সহায়তার আশ্বাস
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও আহত ক্রাইম রিপোর্টারদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্রাইম রিপোর্টাররা প্রতিনিয়ত বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত বা আহত হলে সিএসআর (CSR) ফান্ড কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে তাঁদের সহযোগিতা করা যায় কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
এ ছাড়া পেশাগত শ্রেষ্ঠত্ব ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার স্বীকৃতি হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের সনদ দেওয়ার বিষয়টি আইনগত দিক পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
‘গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ’
গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পণ আখ্যা দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সাংবাদিকরা তাঁদের ওপর অর্পিত সামাজিক দায়বদ্ধতা যথাযথভাবে পালন করলে সমাজ ও রাষ্ট্রে অপরাধ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
রাষ্ট্র ও সমাজের প্রত্যাশা পূরণে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সাংবাদিকদেরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অ্যাসিড সন্ত্রাস রোধের উদাহরণ
অ্যাসিড নিক্ষেপের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অতীতের সাফল্যের উদাহরণ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময় অ্যাসিড নিক্ষেপ বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কঠোর আইন, গণমাধ্যমের বলিষ্ঠ ভূমিকা এবং ব্যাপক সামাজিক সচেতনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বর্তমানে দেশে অ্যাসিড-সংক্রান্ত অপরাধ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
একইভাবে মাদক, অনলাইন জুয়াসহ অন্যান্য অপরাধ নির্মূলেও সাংবাদিক, রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অনলাইন জুয়া ঠেকাতে নতুন আইন
অনলাইন জুয়া ও মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনি কাঠামো আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুগের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুরোনো আইন সংস্কার করা জরুরি।
তিনি বলেন, প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭ পরিবর্তন করে ডিজিটাল মাধ্যমে অনলাইন জুয়া, ম্যাচ ফিক্সিং ও সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র মোকাবেলায় ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
দুর্বল আইনের সুযোগ নিয়ে যাতে অপরাধীরা পার না পায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার ও নতুন আইন প্রণয়নে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
ক্র্যাব সভাপতি মির্জা মেহেদী তমালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) (সচিব পদমর্যাদা) মো. রাশেদ খাঁন।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ক্র্যাবের সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশাহ।
বক্তারা ক্র্যাবের দীর্ঘ ৪৩ বছরের সাংবাদিকতা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের অবদানের প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতেও সংগঠনটি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ধারা অব্যাহত রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
পরে কেক কেটে ক্র্যাবের ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।