নিজস্ব প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক ||
শরতের আকাশ। নীলের বুকজুড়ে তুলোর মতো সাদা মেঘ। দূরে গারো পাহাড়ের সবুজ রেখা। আর তার ঠিক নিচে যতদূর চোখ যায়, বিস্তীর্ণ জলরাশি। সেই জলের বুকজুড়ে ফুটে আছে অসংখ্য লাল শাপলা। বাতাসে দুলছে সবুজ পাতা, তার ফাঁকে ফাঁকে মাথা তুলে আছে টকটকে লাল ফুল।
দূর থেকে দেখলে মনে হবে, সবুজ জলজ পাতার ওপর কেউ যেন বিছিয়ে দিয়েছে লাল ফুলের বিশাল চাদর।
এ দৃশ্য জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার বাট্টাজোড় ইউনিয়নের কুঁড়ি বিলের। বর্ষা পেরিয়ে শরতের এই সময়ে লাল শাপলার অপূর্ব সৌন্দর্যে বদলে গেছে পুরো বিলের চেহারা। প্রকৃতির এই আয়োজন দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন শত শত মানুষ।
কেউ এসেছেন পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। কেউ আবার এসেছেন শুধু প্রকৃতির কাছাকাছি কিছুটা সময় কাটাতে। বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা থেকে শুরু করে নৌকায় চড়ে শাপলার রাজ্যে ঘুরে বেড়ানো—সব মিলিয়ে কুঁড়ি বিল এখন ভ্রমণপিপাসু মানুষের নতুন ঠিকানা।
নৌকায় চড়ে শাপলার রাজ্যে:
কুঁড়ি বিলের সৌন্দর্য শুধু তীরে দাঁড়িয়ে দেখলে যেন পুরোটা ধরা পড়ে না। তাই অনেকেই স্থানীয় নৌকা ভাড়া করে ঢুকে পড়ছেন বিলের ভেতরে।
নৌকা যতই এগোয়, চারপাশে ততই ঘন হয়ে আসে শাপলা। কখনো নৌকার একেবারে পাশে ফুটে থাকা ফুল, কখনো কয়েক হাত দূরে পানির ওপর দুলতে থাকা লাল শাপলা। বৈঠার প্রতিটি টানে পানিতে তৈরি হচ্ছে ছোট ছোট ঢেউ। সেই ঢেউ ছুঁয়ে যাচ্ছে শাপলার পাতা।
নগরের ব্যস্ততা, যানজট আর কর্মব্যস্ত জীবনের বাইরে এমন দৃশ্য যেন কয়েক ঘণ্টার জন্য মানুষকে অন্য এক জগতে নিয়ে যায়।
অনেকে নৌকায় বসেই ছবি তুলছেন। কেউ ভিডিও করছেন। কেউ আবার নীরবে তাকিয়ে থাকছেন শাপলার দিকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে কুঁড়ি বিলের এসব ছবি ও ভিডিও। ফলে বিলটির সৌন্দর্যের খবর পৌঁছে যাচ্ছে আরও দূরের মানুষের কাছে।
শিশুদের উচ্ছ্বাস, তরুণদের ছবি তোলার ব্যস্ততা:
পরিবার নিয়ে আসা শিশুদের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো। নৌকায় ওঠার আনন্দের সঙ্গে যোগ হচ্ছে চারপাশের লাল শাপলার বিস্ময়।
তরুণ-তরুণীদের ব্যস্ততা অবশ্য অন্য রকম। কখনো শাপলার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি, কখনো নৌকার ছাদে বসে ভিডিও, আবার কখনো বন্ধুদের সঙ্গে দলবেঁধে সেলফি। প্রকৃতির এই সৌন্দর্যকে স্মৃতির পাতায় ধরে রাখতেই যেন সবার এত আয়োজন।
শিক্ষার্থীদের অনেককেও দলবেঁধে নৌকায় ঘুরতে দেখা যায়। তাদের কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি কুঁড়ি বিলের দৃশ্য দেখাচ্ছেন।
হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্য ফিরছে:
স্থানীয় প্রবীণদের কাছে কুঁড়ি বিলের শাপলা নতুন কোনো দৃশ্য নয়। তাদের স্মৃতিতে এই বিল একসময় পদ্ম, শাপলা ও নানা ধরনের জলজ উদ্ভিদে ভরপুর ছিল।
বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশি আর জলজ ফুলে বিলটি হয়ে উঠত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বিলের বিভিন্ন অংশে মাছের প্রকল্প গড়ে ওঠায় সেই স্বাভাবিক পরিবেশ অনেকটাই বদলে যায়।
তবে এবার বিলের উত্তরাংশে নতুন করে বিপুলসংখ্যক লাল শাপলা ফুটেছে। স্থানীয়দের কাছে তাই এটি শুধু সৌন্দর্য নয়, হারিয়ে যেতে বসা পুরোনো দিনের একটি পরিচিত দৃশ্য ফিরে আসার আনন্দও।
স্থানীয়দের হিসাবে, প্রায় ১০০ একর এলাকাজুড়ে এবার বিপুলসংখ্যক লাল শাপলা ফুটেছে।
শাপলার সঙ্গে বাড়ছে জীবিকার সম্ভাবনাও
প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে মানুষের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে বিলের আশপাশের অর্থনৈতিক চিত্রও।
দর্শনার্থীদের কেন্দ্র করে বসেছে চা, ফুচকা, কফি ও বিভিন্ন খাবারের অস্থায়ী দোকান। স্থানীয় নৌকার মাঝিদেরও বেড়েছে ব্যস্ততা। ফলে কুঁড়ি বিলের শাপলা শুধু মানুষের চোখের প্রশান্তি নয়, স্থানীয় কিছু মানুষের আয়েরও নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
একটি ফুলের মৌসুমি সৌন্দর্য কীভাবে একটি এলাকার মানুষের জীবনে ছোট্ট অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারে, কুঁড়ি বিল যেন তারই উদাহরণ।
সংরক্ষণ না করলে হারিয়ে যেতে পারে শাপলার রাজ্য:
তবে সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে শঙ্কাও।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, পরিকল্পনাহীনভাবে স্থাপনা তৈরি, অতিরিক্ত মাছের প্রকল্প, ময়লা-আবর্জনা এবং দর্শনার্থীদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে নষ্ট হতে পারে বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ। তাই এখন থেকেই প্রয়োজন পরিকল্পিত সংরক্ষণ।
নিরাপদ নৌযান, দর্শনার্থীদের বসার ব্যবস্থা, স্যানিটেশন, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি বিলের জলজ উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা সরাফত আলী বলেন, ‘কুঁড়ি বিলের লাল শাপলা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ আসছেন। নৌকায় ঘুরে ঘুরে ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। এতে এলাকার মানুষও আনন্দ পাচ্ছেন।
শাপলাগুলো সংরক্ষণে প্রশাসনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
বাট্টাজোড় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লিটন আকন্দ বলেন, ‘শাপলা ফুল দেখার জন্য অনেক দর্শনার্থী বিলে ভিড় করছেন। ক্ষণিকের জন্য ঘুরতে এসে ভ্রমণপিপাসুরা প্রকৃতির বুকে হারিয়ে যাচ্ছেন। উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে বিলটিকে বাণিজ্যিকভাবে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায় কি না, বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে।’
প্রকৃতির কাছে ফেরার এক ঠিকানা:
কুঁড়ি বিলের সৌন্দর্য আসলে শুধু শাপলায় আটকে নেই। এখানে আছে নীল আকাশ, সাদা মেঘ, গারো পাহাড়ের সবুজ, বিস্তীর্ণ জলরাশি আর নৌকার ছলাৎছল শব্দ—সব মিলিয়ে প্রকৃতির এক অনাড়ম্বর আয়োজন।
শহুরে জীবনের ব্যস্ততায় যখন একটু প্রশান্তির জন্য মানুষ ছুটে বেড়ায়, তখন এমন একটি জায়গা সহজেই হয়ে উঠতে পারে একদিনের ভ্রমণের আদর্শ গন্তব্য।
লাল শাপলার এই রাজ্যকে ঘিরে তাই স্থানীয়দের প্রত্যাশাও বড়। যথাযথ সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা করা গেলে বকশীগঞ্জের প্রত্যন্ত কুঁড়ি বিল শুধু মৌসুমি দর্শনীয় স্থান নয়, হয়ে উঠতে পারে জামালপুরের অন্যতম আকর্ষণীয় পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র।
তখন হয়তো শরৎ এলেই আবার লাল শাপলার চাদরে ঢেকে যাবে কুঁড়ি বিল। দূরের গারো পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে নৌকা ভাসবে স্বচ্ছ জলের বুকে। আর প্রকৃতিপ্রেমীরা বলবেন—এ যেন সত্যিই অন্য এক পৃথিবী।