নিজস্ব প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক ||
বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন ৮৩ বছরের বেহুলা বেওয়া। শরীর আর সায় দেয় না। শ্রবণ ও বাকশক্তিও অনেকটাই হারিয়েছেন। ঘর থেকে বের হওয়ার সামর্থ্য নেই। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখন বিছানাই যেন তাঁর পৃথিবী।
শুধু নিজে নন, জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী ৬৫ বছরের ছেলে শুকুর আলীকেও নিয়ে তাঁর এই বিছানাবন্দি জীবন। শেরপুর শহরের চাপাতলী মহল্লায় ছোট বোন মনোয়ারার বাড়ির উঠানের এক কোণে তৈরি করা ছোট্ট একটি ঝুপড়ি ঘরেই মা-ছেলের দিন কাটছে। দুজনেরই নিত্যসঙ্গী অসুস্থতা, দারিদ্র্য আর অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে বেঁচে থাকার কষ্ট।
বেহুলার স্বামী হযরত আলী মারা যান প্রায় সাত বছর আগে। স্বামীর মৃত্যুর পর তিন ছেলেকে নিয়ে শুরু হয় তাঁর কঠিন জীবনসংগ্রাম। প্রতিবন্ধী মেঝো ছেলে শুকুর আলীকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করতেন তিনি। কখনো কাজ জুটত, কখনো জুটত না। সংসারের অভাব ঘোচাতে একপর্যায়ে ভিক্ষাবৃত্তিও শুরু করতে হয় তাঁকে।
এরই মধ্যে বড় ছেলে চান মিয়া ও ছোট ছেলে রহমত বিয়ে করে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় চলে যান। সেখানে একজন দিনমজুর ও অন্যজন রিকশা চালিয়ে কোনো রকমে নিজেদের সংসার চালাচ্ছেন। আর্থিক অনটনের কারণে তাঁরাও নিয়মিত মায়ের পাশে দাঁড়াতে পারেন না। শেরপুরে এলেও মাকে একনজর দেখে আবার ফিরে যেতে হয় তাঁদের।
প্রায় চার বছর আগেও বেহুলা কোনো রকমে চলাফেরা করে ভিক্ষা করতেন। কিন্তু বয়সের ভারে ধীরে ধীরে তাঁর শারীরিক সক্ষমতা কমতে থাকে। একসময় শ্রবণ ও বাকশক্তি হারিয়ে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। অন্যদিকে জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী শুকুর আলীও সবসময় ঘরেই থাকতেন। সম্প্রতি তাঁর শরীরেও নানা রোগব্যাধি বাসা বেঁধেছে। ফলে মা-ছেলের দুজনেরই এখন বিছানা ছেড়ে ওঠার সামর্থ্য নেই।
তাঁদের দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন বেহুলার ছোট বোন ৭০ বছরের মনোয়ারা। নিজের সংসারেই যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে অসুস্থ দুই স্বজনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। তাঁর একমাত্র ছেলের দিনমজুরির আয়েই চলে সংসার। সেই সামান্য আয় থেকেই বেহুলা ও শুকুর আলীর খাবার, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় খরচ চালানোর চেষ্টা করছেন।
মনোয়ারার ওপর দায়িত্বও কম নয়। মা-ছেলের পায়খানা-প্রস্রাব পরিষ্কার করা, গোসল করানো, খাবার খাওয়ানো—সবকিছুই তাঁকে ও তাঁর ছেলেকে করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁরাও এখন অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েছেন।
বেহুলা ও শুকুর আলী দুজনই বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতা পান। তবে সেই সামান্য অর্থ তাঁদের নিত্যদিনের খাবারের প্রয়োজন মেটাতেই শেষ হয়ে যায়। চিকিৎসা তো দূরের কথা, অনেক সময় প্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
মনোয়ারা বলেন, ‘প্রায় ৬০ বছর আগে আমার বোন জামাই মারা যাওয়ার পর বেহুলা এবাড়ি-ওবাড়ি কাজ করে সংসার চালিয়েছে। শেষ বয়সে ভিক্ষা করেও চলেছে। প্রতিবন্ধী ছেলেটার জন্য সে আর দ্বিতীয় বিয়ে করেনি। অন্য দুই ছেলে ঢাকায় রিকশা চালিয়ে ও দিনমজুরি করে খুব কষ্টে সংসার চালাচ্ছে। তাই তারা শেরপুরে এলে একনজর মাকে দেখে আবার চলে যায়।’
তিনি বলেন, ‘শেষ বয়সে এসে আমার বোন ও তার ছেলেটা দুজনই বিছানায় পড়ে আছে। তাদের পায়খানা-প্রস্রাব পরিষ্কার করা, গোসল করানো, খাওয়ানো—সবকিছু আমাকে আর আমার ছেলেকে করতে হয়। আমার একমাত্র ছেলের আয় দিয়ে নিজের সংসারই চালাতে পারছি না। তার ওপর তাদের দায়িত্ব নেওয়ায় এখন আমরা আর পারছি না।’
আক্ষেপের সুরে মনোয়ারা বলেন, ‘তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে হয়তো কিছুটা সুস্থ হতে পারত। সরকারের কাছে আমার আকুতি, তাদের চিকিৎসার জন্য যেন সহযোগিতা করা হয়।’
বেহুলা ও শুকুর আলীর থাকার ঘরটিও মনোয়ারার নিজের জমির ওপর তৈরি। সহায়-সম্বল বলতে তাঁদের কিছুই নেই। বড় বোন অসহায় হওয়ায় মানবিক কারণে তাঁকে নিজের বাড়ির উঠানের এক কোণে আশ্রয় দিয়েছেন মনোয়ারা।
জীবনের শেষ বয়সে এসে বেহুলার চাওয়া-পাওয়ার তালিকাও ছোট। একটু চিকিৎসা, নিয়মিত খাবার আর মাথা গোঁজার নিরাপদ একটি জায়গা—এইটুকুই যেন তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন। আর প্রতিবন্ধী ছেলে শুকুর আলীর জন্যও প্রয়োজন চিকিৎসা ও নিয়মিত পরিচর্যা।
অসহায় এই মা-ছেলের মানবেতর জীবন কাটছে নীরবে। তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর মতো সামর্থ্য নেই পরিবারের। এখন সরকারি সহায়তা, চিকিৎসা এবং মানবিক মানুষের সহযোগিতাই পারে বেহুলা ও শুকুর আলীর জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে দিতে।