নিজস্ব প্রতিবেদক : মেহেদী হাসান শামীম ||
বয়স মাত্র ৪৩ বছর। অথচ অসুস্থতায় নুয়ে পড়া শরীর দেখে মনে হয়, বয়স যেন অনেক আগেই তাঁকে হার মানিয়েছে। দাঁড়াতে পারেন না, ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। ঘর থেকে বের করে একটি চেয়ারে বসিয়ে দিলে সেখানেই কেটে যায় দিনের পর দিন। এভাবেই দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চেয়ারে বসে জীবন পার করছেন শেরপুর সদর উপজেলার ফটিয়ামারি নতুন পাড়া এলাকার অজুফা বেগম।
অজুফার স্বামী গেন্দু মিয়া মারা গেছেন ১০ বছর আগে। স্বামীর মৃত্যুর পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনিও। অর্থের অভাবে নিয়মিত চিকিৎসা করাতে পারেননি। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা এখন তাঁকে অনেকটাই চলৎশক্তিহীন করে দিয়েছে। বর্তমানে ১২ বছরের ছোট মেয়েটিই তাঁর প্রধান ভরসা। মেয়েটিই মায়ের সেবা-যত্ন থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করে দেয়। মাঝেমধ্যে বড় ছেলের স্ত্রীও শাশুড়ির দেখাশোনা করেন।
পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১৫ বছর আগে মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুর এলাকায় কাজ করতে গিয়েছিলেন অজুফা। সেখানে কাজ করার সময় ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু অভাবের কারণে চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেননি। এরপর অসুস্থতা বাড়তে থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা আর হয়ে ওঠেনি।
অজুফার সংসারে রয়েছে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে অটোরিকশা চালান, ছোট ছেলে দিনমজুরের কাজ করেন। নিজেদের সংসার চালাতেই তাঁদের কষ্ট হয়। ফলে মায়ের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার খরচ বহন করা তাঁদের পক্ষে কঠিন। অজুফার নিজের বলতে রয়েছে মাত্র দুই শতাংশ জমি।
প্রতিদিন সকালে ছোট মেয়েটি মাকে ঘর থেকে বাইরে এনে চেয়ারে বসিয়ে দেয়। এরপর দিনের বেশির ভাগ সময় সেখানেই বসে থাকতে হয় অজুফাকে। কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলেও নিজে উঠে যেতে পারেন না। মেয়ের সাহায্যই তাঁর একমাত্র অবলম্বন।
অজুফা বেগম বলেন, “আমার স্বামী মারা গেছে ১০ বছর হয়েছে। তারপর থেকেই আমিও অসুস্থ হয়ে পড়ি। ঠিকমতো উঠতে পারি না, চলাফেরা করতে পারি না। এখন ছোট্ট মেয়ের ওপরই আমার ভরসা। চেয়ারে বসে থাকতে আর ভালো লাগে না। মেয়েটাই আমার সেবা-যত্নসহ সবকিছু করে।”
তিনি আরও বলেন, “সকালে মেয়েটা আমাকে ঘর থেকে বের করে চেয়ারে বসিয়ে দেয়। সারাদিন চেয়ারে বসে থাকতে হয়। একটু উঠে কোথাও যাব, সেই সাধ্যও নেই। আল্লাহ আমাকে কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ফেলেছেন।”
স্থানীয় বাসিন্দা আলী আকবর বলেন, “অজুফা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। টাকার অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারেননি। এখন তাঁর অবস্থা খুবই খারাপ। সহযোগিতা পেলে উন্নত চিকিৎসা করানো সম্ভব হতে পারে।”
সেনাসদস্য নাজমুল হাসানও অজুফার চিকিৎসার জন্য সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসার অভাবে অসুস্থ এই নারীর পাশে সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়ে এলে তাঁর চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
১০ বছর ধরে একটি চেয়ারে বসেই দিন কাটছে অজুফার। একসময় কাজ করে সংসার চালানো এই নারী এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতেও পারেন না। মায়ের এই অসহায় জীবন দেখেই দিন কাটছে ১২ বছরের মেয়েটির। চিকিৎসা পেলে আবার স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবেন- এই আশাতেই দিন গুনছেন অজুফা।