নিজস্ব প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক ||
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার দীঘিরপাড় গ্রামের ঝমেলা বেগমের বয়স ৭০ পেরিয়েছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আপন বলতে তেমন কেউ নেই তাঁর। ২০ বছর আগে মারা গেছেন একমাত্র মেয়েও। অসুস্থতার চিকিৎসা করাতে গিয়ে একসময় বিক্রি করতে হয়েছে নিজের ভিটেমাটিও। তাতেও ফেরেনি সুস্থতা। অর্থের অভাবে এখন প্রায় বিনা চিকিৎসায় দিন কাটছে তাঁর।
ঘরের চার দেয়ালই যেন হয়ে উঠেছিল ঝমেলার পুরো পৃথিবী। দীর্ঘ ১০ বছরের বেশি সময় ধরে অসুস্থতার কারণে বিছানায় পড়ে ছিলেন তিনি। ঘরটিতেও ছিল না বিদ্যুতের সংযোগ। দিনের আলো ফুরিয়ে গেলে অন্ধকারেই কেটে যেত তাঁর রাত।
এই দীর্ঘ অন্ধকার জীবনে মঙ্গলবার একটু ব্যতিক্রম ঘটল। প্রায় এক দশক পর হুইলচেয়ারে বসিয়ে তাঁকে ঘরের বাইরে আনা হলো। দীর্ঘদিন পর বাইরের আলো-বাতাস পেলেন তিনি।
ঝমেলার জীবনে একসময় কিছুটা আশ্রয় হয়ে এসেছিল জোসনা নামের একটি মেয়ে। নিজের নাতনি হিসেবে তাঁকে লালন-পালন করেছিলেন ঝমেলা। পরে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় জোসনার বিয়ে হয়। কিন্তু জোসনার সংসারেও অভাবের ছায়া কাটেনি। বর্তমানে অন্যের বাড়িতে বসবাস করে তাঁর পরিবার।
ফলে ইচ্ছা থাকলেও অসহায় ঝমেলার নিয়মিত দেখাশোনা করা জোসনা ও তাঁর পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।
এলাকাবাসীর সহায়তায় কোনোভাবে খাবার জোটে ঝমেলার। কিন্তু চিকিৎসা, নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবার অভাবে বছরের পর বছর কষ্টে দিন পার করছেন তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ঝমেলা কোনো সরকারি ভাতাও পান না। অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার খরচ জোগাতে নিজের ভিটেমাটিও বিক্রি করেছেন। কিন্তু চিকিৎসা করিয়েও সুস্থ হতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত অর্থের অভাবে চিকিৎসাও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
এখন তাঁর প্রয়োজন খুব বেশি কিছু নয়। দরকার একটু চিকিৎসা, মাথার ওপর নিরাপদ একটি ছাদ, অন্ধকার ঘরে বিদ্যুতের আলো এবং শেষ বয়সে পাশে দাঁড়ানোর মতো কিছু মানুষ।
ঝমেলার এই অসহায় জীবনের খবর জানতে পেরে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার তাঁকে হুইলচেয়ার ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর জন্য নিরাপদ ঘর, বিদ্যুৎ ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘ঝমেলা বেগমের অসহায়ত্বের বিষয়টি জানতে পেরে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছি। হুইলচেয়ার ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি তাঁর জন্য একটি নিরাপদ ঘর, বিদ্যুৎ ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তার আওতায় তাঁকে আনারও উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
দীর্ঘ ১০ বছর পর হুইলচেয়ারে বসে ঘরের বাইরে এসেছিলেন ঝমেলা। হয়তো তাঁর চাওয়া-পাওয়ার তালিকাও এখন খুব ছোট। শুধু একটু আলো, একটু নিরাপদ আশ্রয় আর অসুস্থ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা।
জীবনের এতটা পথ কষ্টে পাড়ি দেওয়া এই বৃদ্ধার জন্য প্রশাসনের উদ্যোগ তাই শুধু একটি হুইলচেয়ার বা কিছু অর্থ সহায়তা নয়। দীর্ঘদিন অন্ধকারে থাকা ঝমেলার ঘরে এবার সত্যিই আলো জ্বলার অপেক্ষা।