নিজস্ব প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক ||
‘ও বৌ ধান ভানেরে ঢেঁকিতে পার দিয়া, ঢেঁকি নাচে, বৌ নাচে হেলিয়া দুলিয়া—ও বৌ ধান ভানেরে।’ একসময় শেরপুরের গ্রামবাংলায় ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ আর লোকগানের সুরে মুখর থাকত জনপদ। নতুন ধান ঘরে উঠলেই বাড়িতে বাড়িতে বসত ঢেঁকি। শুরু হতো ধান ভানা, পিঠা-পায়েশ তৈরি আর নবান্নের উৎসব।
সময়ের পরিক্রমায় সেই ঢেঁকি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। আধুনিক রাইস ও ফ্লাওয়ার মিলের দাপটে গ্রাম থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শত বছরের এই ঐতিহ্য; সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে ঢেঁকিছাঁটা চাল, লোকজ গান আর নবান্নের সেই প্রাণবন্ত স্মৃতিও।
একসময় ধান থেকে চাল তৈরির অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল ঢেঁকি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে নতুন ধান ঘরে তোলার পর ঢেঁকিতে ধান ভানার ব্যস্ততা শুরু হতো। পরিবারের বৌ-ঝিরা পালাক্রমে ঢেঁকিতে ধান ভানতেন। ঢেঁকির ওঠানামার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলত গল্প, হাসি-ঠাট্টা আর গান। কাজের ক্লান্তিও যেন আনন্দের কাছে হার মানত।
নতুন ধানের মৌসুম মানেই ছিল নবান্নের আয়োজন। ঢেঁকিতে ধান ভেনে তৈরি করা হতো আটা ও চালের গুঁড়া। সেই গুঁড়া দিয়ে বানানো হতো নানা ধরনের পিঠা-পুলি। বাড়িতে বাড়িতে বসত পিঠা তৈরির ধুম। তৈরি হতো পায়েশসহ নানা মুখরোচক খাবার। শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠত বাড়ির আঙিনা।
প্রতাবনগরের শতবর্ষী ডা. আব্দুল বারী ও শালচুড়া গ্রামের আলহাজ্ব সরোয়ার্দী দুদু মণ্ডল সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে বলেন, নতুন ধান ঘরে ওঠার পর গ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ তৈরি হতো। ঢেঁকিতে ধান ভেনে নবান্নের আটা তৈরি করা হতো। এরপর শুরু হতো পিঠা-পায়েশ তৈরির আয়োজন।
পরিবারের সবাই এতে অংশ নিতেন। শিশু-কিশোররা নেচে-গেয়ে আনন্দ করত।
তাঁদের ভাষ্য, সেই সময়ের পারিবারিক ও সামাজিক আনন্দের সঙ্গে ঢেঁকি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। ধান ভানাকে শুধু গৃহস্থালির কাজ হিসেবে দেখা হতো না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল পারস্পরিক সহযোগিতা, লোকসংগীত ও গ্রামীণ সংস্কৃতি। এখন সেসব দৃশ্য অনেকটাই স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে।
শুধু ধান ভানাই নয়, ঢেঁকিছাঁটা চালের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে গ্রামীণ জীবনের দীর্ঘ ইতিহাস। আধুনিক যন্ত্রে দ্রুত ধান ভাঙানো সম্ভব হওয়ায় ঢেঁকির প্রয়োজনীয়তা কমেছে। শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও এখন রাইস মিল ও ফ্লাওয়ার মিলের বিস্তার ঘটেছে। ফলে ঘরের কোণে পড়ে থাকা পুরনো ঢেঁকিগুলোও একে একে হারিয়ে যাচ্ছে।
একসময় প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ঢেঁকি থাকলেও এখন দু-একটি বাড়িতে পুরনো ঢেঁকি চোখে পড়ে। সেগুলোর অধিকাংশই আর নিয়মিত ব্যবহার হয় না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই ঢেঁকি দেখেছে শুধু গল্পে, ছবিতে কিংবা প্রবীণদের স্মৃতিচারণে।
প্রবীণদের মতে, আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবনযাত্রা বদলাবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে এর সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধরে রাখার উদ্যোগও প্রয়োজন। কারণ ঢেঁকি শুধু ধান ভানার একটি কাঠের যন্ত্র নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামবাংলার নারীদের শ্রম, পারিবারিক বন্ধন, লোকগান, নবান্ন এবং একসময়ের সরল-স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
সময়ের সঙ্গে শেরপুরের গ্রামেও বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন আর ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢেঁকির ‘ঠক ঠক’ শব্দ শোনা যায় না। নতুন ধানের ঘ্রাণে বাড়িতে বাড়িতে আগের মতো পিঠা তৈরির আয়োজনও নেই। যান্ত্রিকতার দ্রুতগতির কাছে হার মেনেছে ঢেঁকির ধীর ছন্দ।
এভাবে চলতে থাকলে হয়তো কয়েক বছর পর শেরপুরের গ্রামাঞ্চলে বাস্তব জীবনে আর কোনো ঢেঁকিই দেখা যাবে না। পুরনো কোনো বাড়ির আঙিনায় পড়ে থাকা কাঠের ঢেঁকি কিংবা জাদুঘর ও ছবির ফ্রেমেই তখন খুঁজতে হবে সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য।
ঢেঁকির ছন্দ হয়তো থেমে গেছে, কিন্তু প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনো বেঁচে আছে নবান্নের সেই দিন—ধান ভানার গান, উঠানের পিঠা-পায়েশ আর পরিবারের সবাইকে নিয়ে আনন্দে মেতে ওঠার সেই সোনালি সময়।