নিজস্ব প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক ||
দীর্ঘ আট বছর পর ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলচালক আবু বকর নূরী (৫০) হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ ঘটনায় জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তার, ছিনিয়ে নেওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায়ের ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় বিভাগীয় পুরস্কার পেয়েছেন সিআইডি জামালপুর ইউনিটের পরিদর্শক মো. মোস্তাফিজুর রহমান।
সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজধানীর সিআইডি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় তাঁর হাতে নগদ অর্থ পুরস্কার তুলে দেন সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন।
সিআইডি সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২ জুলাই জামালপুরের ইসলামপুর থানার চুংরাপাড়া এলাকায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলচালক আবু বকর নূরী। ওই দিন ভাড়ায় যাত্রী নেওয়ার উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেল নিয়ে বকশীগঞ্জ বাজারের দিকে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। রাতে বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা তাঁর খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে ইসলামপুরের চুংরাপাড়া গ্রামের পুবেরবন্দ এলাকায় একটি মরদেহ পড়ে থাকার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান তাঁর স্ত্রী। সেখানে মরদেহটি স্বামীর বলে শনাক্ত করেন তিনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন রাত আনুমানিক সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে সংঘবদ্ধ একটি অপরাধীচক্র মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে কৌশলে আবু বকর নূরীকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়। সেখানে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাঁকে হত্যা করে মোটরসাইকেলটি নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে ইসলামপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। ২০১৮ সালের ৩ জুলাই দায়ের করা মামলাটির নম্বর ২। প্রথমে ইসলামপুর থানা পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে ২০২০ সালের ১৯ আগস্ট মামলাটির তদন্তভার নেয় সিআইডি।
তদন্তভার গ্রহণের পর মামলার বিভিন্ন দিক নতুন করে পর্যালোচনা শুরু করেন সিআইডি জামালপুর ইউনিটের তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান। একপর্যায়ে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে নিহতের মোটরসাইকেলে থাকা তিন অজ্ঞাত ব্যক্তির ছবি সংগ্রহ করেন তিনি। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় তাঁদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পরে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করতে জামালপুরসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থান, হাটবাজার ও জনসমাগমস্থলে প্রায় পাঁচ হাজার পোস্টার লাগানো হয়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন কনটেন্টের মাধ্যমে তাঁদের ছবি প্রচার করা হয়। তথ্যদাতার জন্য ঘোষণা করা হয় এক লাখ টাকা পুরস্কার।
এ প্রচারণার ফলে বিভিন্ন সূত্র থেকে সন্দেহভাজনদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, ফরেনসিক যাচাই ও বিশেষ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়।একাধিকবার অভিযান পরিচালনার পর চলতি বছরের আগস্টে গাজীপুর ও জামালপুরের বিভিন্ন স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে ছিনিয়ে নেওয়া মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত আরও কয়েকজনকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ আট বছর ধরে অমীমাংসিত থাকা হত্যাকাণ্ডটির রহস্য উদঘাটিত হয়।
পুরস্কারপ্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের জটিল রহস্য উদঘাটনে প্রতিনিয়ত দিকনির্দেশনা ও বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে পাশে ছিলেন শ্রদ্ধেয় অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার স্বাগতা ভট্টাচার্য্য। প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে অভিযানিক কাজে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছে সিআইডির এলআইসি টিম। এ ছাড়া সিআইডি জামালপুর ইউনিটের সব কর্মকর্তা ও সদস্য এবং বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দিয়ে যাঁরা সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রাপ্তি দায়িত্ববোধ ও পেশাগত কাজের প্রতি অনুপ্রেরণা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চাকরির বাকি সময় যেন পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করে যেতে পারি, এ জন্য সবার দোয়া চাই।’
এদিকে পুরস্কার পাওয়ায় পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন সিআইডি জামালপুর ইউনিটের কর্মকর্তা ও সদস্যরা।