নিজস্ব প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক ||
যে বয়সে বাবার হাত ধরে পূজামণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন যুথি মনি পাল। বাবার কাছ থেকে শেখা প্রতিমা তৈরির কাজই এখন তাঁর পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন। নিজের হাতে গড়েছেন ১৮টি দুর্গাপ্রতিমা। তবে সেই প্রতিমা গড়ার আড়ালে চাপা পড়ে আছে তাঁর নিজের একটি স্বপ্ন—পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে পড়াশোনা করে একজন ভাস্কর্যশিল্পী হওয়া।
শেরপুর সদর উপজেলার ভাতশালা ইউনিয়নের বয়রা পরানপুর পালপাড়ার বাসিন্দা যুথি। এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন তিনি। পূজার আনন্দ উপভোগ করার বদলে এখন তাঁকে ছুটতে হচ্ছে এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে। তিন মাস ধরে প্রতিমা তৈরির পর এখন বকেয়া টাকা আদায়ে ব্যস্ত সময় কাটছে তাঁর। দিন-রাতের হিসাব ভুলে সংসারের হাল ধরার পাশাপাশি স্বপ্নপূরণের আশাও বাঁচিয়ে রেখেছেন এই কিশোরী।
যুথি মনি পাল প্রয়াত দীপক কুমার পালের দ্বিতীয় মেয়ে। বংশপরম্পরায় দীপক কুমার প্রতিমা তৈরি ও মাটির বিভিন্ন সামগ্রী নির্মাণের কাজ করতেন। তাঁর তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর আগে। মেজ মেয়ে যুথি এবার শহরের মডেল গার্লস ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। ছোট মেয়ে প্রিয়াঙ্কা রানী পাল স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে।
২০২৪ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ মারা যান দীপক কুমার পাল। স্বামীর মৃত্যুতে বিপাকে পড়েন স্ত্রী রেখা রানী পাল। দুই মেয়েকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে বাবার রেখে যাওয়া প্রতিমা তৈরির কাজের হাল ধরেন যুথি।
ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে থেকে প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতেন তিনি। ধীরে ধীরে মাটি ও খড় দিয়ে প্রতিমা তৈরি, রং করা এবং প্রতিমায় পোশাক পরানোর কাজও শিখে নেন। বাবার কাছ থেকে শেখা সেই সামান্য অভিজ্ঞতাই পরে হয়ে ওঠে তাঁর পরিবারের আয়ের প্রধান অবলম্বন।
কোমল হাতে মাটি ও খড় দিয়ে প্রতিমা গড়ার পাশাপাশি মনে মনে নিজের ভবিষ্যৎও গড়তে থাকেন যুথি। স্বপ্ন দেখেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে ভর্তি হবেন। পড়াশোনা করে দক্ষ ভাস্কর্যশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। স্বপ্ন পূরণের প্রস্তুতি নেওয়ার বদলে তাঁকে মনোযোগ দিতে হয় পরিবারের জীবিকা নির্বাহে।
চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু সংসারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ হয়নি। এর মধ্যেই তিন মাস ধরে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজ করেছেন। এ বছর শেরপুর শহরের ১৮টি পূজামণ্ডপে প্রতিমা সরবরাহ করেছেন তিনি। কাজের সহযোগিতার জন্য বাবার মতোই তিনজন কারিগর রেখেছেন, যাঁদের বেতন ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা।
পূজার আগেই মণ্ডপসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সব প্রতিমা নিয়ে গেছেন। তবে কয়েকটি প্রতিমার টাকা এখনো বকেয়া রয়েছে। সেই টাকা আদায়ের জন্য প্রতিদিনই একবেলা করে বিভিন্ন মণ্ডপে ঘুরছেন যুথি। পূজা শেষ হওয়ার আগেই বকেয়া টাকা হাতে পাওয়ার আশা তাঁর।
যুথি মনি পাল বলেন, ‘আমার খুব স্বপ্ন ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে পড়ব এবং একজন ভাস্কর্যশিল্পী হব। কিন্তু বাবা হঠাৎ মারা যাওয়ার পর আমরা অথৈ জলে পড়ে যাই। নিজের স্বপ্নকে বুকে চেপে বাবার কাজের হাল ধরি। গত দুই বছরে মোটামুটি ভালো প্রতিমা তৈরির কাজ পেয়েছি। এভাবেই সংসারটাকে টিকিয়ে রেখেছি।’
যুথি আরও বলেন, ‘সংসার চালানোর পাশাপাশি আমার, মা ও ছোট বোনের পড়াশোনার খরচও এখান থেকে চালাতে হচ্ছে। গত তিন মাস ধরে পূজার প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকায় পরীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তি হতে পারিনি। এখন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি গাইড পড়ে প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ভাবছি। যতটুকু সময় আছে, তার মধ্যেই চেষ্টা চালিয়ে যাব। বাকিটা ভগবানের ইচ্ছা।’
সংসারের হাল ধরলেও বাবার প্রতিমা তৈরির কাজ চালিয়ে যেতে চান যুথি। সেই সঙ্গে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চেষ্টাও অব্যাহত রাখতে চান তিনি।
যুথির মা রেখা রানী পাল বলেন, ‘পূজার সময় তাদের বাবা তিন মেয়ের হাত ধরে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে পূজা দেখাতেন। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। এইটুকু মেয়ের হাতে খড়-মাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরি করতে দেখে খুব কষ্ট হয়। কিন্তু করার কিছু নেই। সংসার তো চালাতে হবে। ভগবানই দেখবেন—এই আশা নিয়ে বেঁচে আছি।’
বাবার হাত ধরে পূজামণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। সেই বাবার শেখানো শিল্পকর্ম আঁকড়ে ধরেই যুথি এগিয়ে চলেছেন জীবনের কঠিন পথে। সংসারের দায়িত্ব আর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন—দুইয়ের ভার সামলে তাঁর এই লড়াই এখন ভবিষ্যৎ গড়ার নিরন্তর চেষ্টা।