নিজস্ব প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক ||
ইসলামে এতিমদের প্রতি সদয় আচরণ, তাদের অধিকার সংরক্ষণ এবং সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতিমের প্রতি অবহেলা, তাদের সম্পদ আত্মসাৎ কিংবা সাহায্যপ্রার্থীকে তিরস্কার করাকে নিন্দনীয় কাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে। একই সঙ্গে এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ ও তাদের লালন-পালনকে বিশেষ সওয়াবের কাজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
ইসলামি পরিভাষায় যে শিশুর পিতা ইন্তেকাল করেছেন, তাকে এতিম বলা হয়। পিতৃহীন এসব শিশুর নিরাপত্তা, ভরণপোষণ ও অধিকার নিশ্চিত করতে ইসলাম সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। এতিমদের কল্যাণে কাজ করা এবং তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
পবিত্র কোরআনে এতিমদের বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা তোমাকে এতিমদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলো, তাদের কল্যাণ সাধন করাই উত্তম। তোমরা যদি তাদের সঙ্গে একত্রে থাকো, তবে তারা তোমাদের ভাই।’(সুরা বাকারা, আয়াত ২২০)
এই আয়াতে এতিমদের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং তাদের সঙ্গে মানবিক আচরণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। তাদের লালন-পালন ও ভরণপোষণের ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে, যাতে তাদের প্রকৃত কল্যাণ সাধিত হয়।
এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ গুরুতর অপরাধ
এতিমদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি তাদের সম্পদ যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে ইসলাম। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর এতিমদের তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দাও। ভালো সম্পদের সঙ্গে মন্দ সম্পদ বদল কোরো না এবং তাদের সম্পদ তোমাদের সম্পদের সঙ্গে মিশিয়ে গ্রাস কোরো না।নিশ্চয়ই এটি মহাপাপ।’ (সুরা নিসা, আয়াত ২)
এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করাকে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, তারা তো নিজেদের পেটে আগুনই ভক্ষণ করে। আর অচিরেই তারা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত ১০)
এই নির্দেশনার মাধ্যমে এতিমের সম্পদ সংরক্ষণ, তাদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকত্বের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সততা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এতিমের প্রতি সদয় হওয়ার নির্দেশ
এতিমের প্রতি কঠোর আচরণ ও সাহায্যপ্রার্থীকে তিরস্কার করতে নিষেধ করেছে ইসলাম। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না। আর সাহায্যপ্রার্থীকে ধমক দিয়ো না। আর তোমার রবের নিয়ামতের কথা প্রকাশ করো।’ (সুরা আদ-দুহা, আয়াত ৯-১১)
এ নির্দেশনা এতিম ও অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, সম্মান এবং মানবিক আচরণের শিক্ষা দেয়। তাদের অসহায়ত্বকে অবহেলার কারণ না বানিয়ে বরং পাশে দাঁড়ানোই ইসলামের প্রত্যাশা।
এতিমের দায়িত্ব গ্রহণের বিশেষ মর্যাদা
এতিমের লালন-পালন ও দায়িত্ব গ্রহণের জন্য মহান পুরস্কারের কথাও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি এবং এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী ব্যক্তি জান্নাতে এভাবে থাকব।’ এ কথা বলার সময় তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল দিয়ে ইশারা করেন। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
এই হাদিসে এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ, তাদের লালন-পালন এবং সুরক্ষায় ভূমিকা রাখার বিশেষ মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে। এতিমের পাশে দাঁড়ানো শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং ইসলামের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কাজ।
এতিমের সম্পদ ভক্ষণ ধ্বংসাত্মক পাপ
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাতটি ধ্বংসাত্মক পাপ থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। সাহাবিরা জানতে চাইলে তিনি সেগুলোর মধ্যে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, জাদু করা, অন্যায়ভাবে প্রাণ হত্যা, সুদ খাওয়া, এতিমের সম্পদ ভক্ষণ, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন এবং সতী-সাধ্বী মুমিন নারীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
হাদিসের এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। তাই এতিমদের অধিকার রক্ষা, তাদের সম্পদ সংরক্ষণ এবং নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব।
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, এতিমের প্রতি সদয় আচরণ, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং অসহায় অবস্থায় পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই প্রকৃত মানবিকতার প্রকাশ ঘটে।
লেখক: মাওলানা আবদুর রশিদ, ইসলামি গবেষক