প্লাস্টিক দূষণ রোধে সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেছেন, অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পুনঃব্যবহার বাড়ানো এবং বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার মাধ্যমে চক্রাকার অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ন্যাশনাল প্লাস্টিক অ্যাকশন পার্টনারশিপ (এনপিএপি) বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘চক্রাকার অর্থনীতির পথে সমন্বিত উদ্যোগ’ প্রতিপাদ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, ইউএনডিপি বাংলাদেশ এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গ্লোবাল প্লাস্টিক অ্যাকশন পার্টনারশিপ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, প্লাস্টিক দূষণ নগরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নদ-নদী, জলাভূমি, উপকূল, জনস্বাস্থ্য ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে প্লাস্টিক উৎপাদন, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেও জড়িত। তাই এ সমস্যার কার্যকর সমাধানে প্লাস্টিকের উৎপাদন থেকে শুরু করে ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে বিবেচনায় নিতে হবে।
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা (ইপিআর) নির্দেশিকা, ২০২৬-এর গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য, উৎপাদক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
এনপিএপি বাংলাদেশের ভূমিকা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এ প্ল্যাটফর্ম বিভিন্ন খাতের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগগুলোকে একত্র করা, নীতির সঙ্গে বাস্তবায়নের সংযোগ স্থাপন, উদ্ভাবনী সমাধানকে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা এবং জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে বিনিয়োগ সমন্বয়ে সহায়তা করবে। সরকার এ উদ্যোগে নেতৃত্ব দেবে উল্লেখ করে তিনি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান এবং এনপিএপি বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
মন্ত্রী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাস্তবসম্মত সমাধান ও বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তি শক্তিশালী করা, উন্নয়ন সহযোগীদের জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সহায়তা সমন্বয় এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চক্রাকার অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধানের পরামর্শ দেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, এনপিএপির সাফল্য সভা বা আলোচনার সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন, নির্ভরযোগ্য তথ্যের উন্নয়ন, সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কার্যকর সমাধানের প্রসার এবং জনগোষ্ঠী ও বর্জ্যকর্মীদের জীবনমানের উন্নয়নই হবে এ উদ্যোগের সাফল্যের মাপকাঠি।
অনুষ্ঠানে ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিগেজ বলেন, প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব শুধু বর্জ্য ফেলার স্থানেই সীমাবদ্ধ থাকে না। প্লাস্টিক বর্জ্য নালা বন্ধ করে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ায় এবং নদ-নদীর মাধ্যমে সাগরে পৌঁছায়। এ ছাড়া খোলা জায়গায় প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন বর্জ্য পোড়ানোর ফলে ক্ষতিকর কণা ও বিষাক্ত পদার্থ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা স্থানীয় বাসিন্দা ও বর্জ্যকর্মীদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
তিনি বলেন, পরিবারগুলোকে বর্জ্য আলাদা করে রাখার বিষয়ে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বর্জ্য সংগ্রহের সময় পৃথকীকরণ বজায় রাখা এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গ্লোবাল প্লাস্টিক অ্যাকশন পার্টনারশিপের পরিচালক ক্লেমঁস শ্মিড অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তা দেন। এদিকে ইউএনডিপি জানায়, এনপিএপি বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে একটি নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে প্লাস্টিকবিষয়ক অভিন্ন জাতীয় তথ্যভিত্তি তৈরি, অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং তথ্যপ্রমাণভিত্তিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ, পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ সোলায়মান হায়দার এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশের সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি সরদার এম. আসাদুজ্জামান।
এ সময় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থা, কূটনৈতিক মিশন, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য করুন