"একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু"
-হাসান শরাফত
সুরুজ মিয়ার কাঁধের বাঁকটা প্রতিদিন সকালে যখন নামে, তখন তাতে ঝুলতে থাকে রঙ-বেরঙের ফিতা, কাঁচের চুড়ি, আলতা, স্নো আর সস্তা প্লাস্টিকের খেলনা। গ্রামের মেঠোপথ ধরে হেঁটে হেঁটে তিনি ডাক ছাড়েন, "চাই চুড়ি... চাই খেলনা..."। মাথার ওপর তপ্ত সূর্য, কপালে ঘামের রেখা। কিন্তু সুরুজ মিয়ার ক্লান্তি নেই। তাঁর মনের ভেতর সারাক্ষণ একটা সুর বাজে—তাঁর মেয়ে সুলতানা।
সুলতানা এবার পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। শুধু পড়ালেখা নয়, খেলাধুলা থেকে শুরু করে সবকিছুতে সে সেরা। ক্লাসের রোল নম্বরটা তার সবসময় ‘১’। সুরুজ মিয়া চা স্টলে বসলেই গ্রামের মাতব্বর থেকে শুরু করে রিকশাচালক কাসেম—সবাই বলে, "সুরুজ মিয়া, তোমার ভবিষ্যৎ তো একেবারে ঝলমলে। মেয়ে তোমার জজ-ব্যারিস্টার কিংবা ডাক্তার হইবো। তখন এই কষ্টের দিন আর থাকবো না।"
লোকদের মুখে এসব কথা শুনলে সুরুজ মিয়ার বুকের ছাতি গর্বে ফুলে ওঠে। ক্ষণিকের জন্য সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির ক্লান্তি উবে যায়। সংসারের এই টানাটানির মাঝেও সুলতানার পড়াশোনা যেনো বন্ধ না হয়, সেজন্য মা রাহেলা বেগম বসে থাকেননি। বাড়ির অদূরে রফিজ মন্ডলের বড় বাড়িতে তিনি ঝিয়ের কাজ নিয়েছেন। মা-বাবার এই আত্মত্যাগ সুলতানাও বোঝে। তাই কোনোদিন কোনো কিছুর আবদার করে না সে।
সেদিন ছিল সুলতানার প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার শেষ দিন। পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরে সুলতানা তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো, "বাজান, পরীক্ষা তো শেষ। স্কুল কয়দিন বন্ধ। আমাগো খালার বাড়ি বেড়াইতে যামু। কিন্তু আমার তো কোনো ভালো জামা নাই। যদি পারো, আমারে একটা লাল জামা কিনা দিবা বাজান?"
সুরুজ মিয়ার চোখ দুটো ভিজে এলো। মেয়েটা আজ পর্যন্ত কোনোদিন খাতা-কলম ছাড়া বাড়তি কিছু চায়নি। তিনি সুলতানার মাথায় হাত রেখে বললেন, "মা রে, তুই চিন্তা করিস না। আজ যত দূর পর্যন্ত ফেরি করতে হয় করুম, তাও তোর জন্য লাল জামা নিয়া আসুম।"
পরদিন সকালে অন্যদিনের চেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে সুরুজ মিয়া ফেরি করতে বের হলেন। অনেক দূর হেঁটে হেঁটে তিনি সব জিনিস বিক্রি করলেন। দিনশেষে যখন তাঁর হাতে একটা লাল টুকটুকে জামা এলো, তখন সুরুজ মিয়ার মনে হলো তিনি দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী মানুষ। জামাটা বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি বাড়ির পানে রওনা হলেন। ওদিকে দুপুরে রাহেলা বেগম যখন মন্ডল বাড়িতে কাজে গিয়েছিলেন, বাড়ি তখন একেবারে নিঝুম। সুলতানা বারান্দায় বসে বই গুছাচ্ছিল। এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল পাশের বাড়ির ঝন্টু রানা নামের এক নরপিশাচ। নরকের কীট ঝন্টু অনেকদিন ধরেই এই অসহায় পরিবারটির ওপর নজর রাখছিলো।
ফাঁকা বাড়ির সুযোগ নিয়ে ঝন্টু মরণ থাবা বসায় নিষ্পাপ সুলতানার ওপর। সুলতানা চিৎকার করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেই চিৎকার ঘরের বাইরে পৌঁছায়নি মুখ বাঁধার কারণে। নিজের পাশবিক লালসা চরিতার্থ করার পর, ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে পিশাচ ঝন্টু সুলতানার গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলে। কিছুক্ষণ ছটফট করে শান্ত হয়ে যায় গ্রামের সবচেয়ে মেধাবী মেয়েটি। ঝন্টু শুধু একটি প্রাণ কাড়েনি, সে কেড়ে নিলো একজন ফেরিওয়ালার স্বপ্ন বেঁচে থাকার একমাত্র প্রদীপ এবং একটি গ্রাম তথা দেশের সম্পদ।
বিকেলের সূর্য তখন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। সুরুজ মিয়া বাড়ির উঠোনে পা দিয়েই ডাকলেন, "মা সুলতানা, দেখ তোর বাজান কী আনছে!" কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া এলো না। ঘরের দরজাটা আধখোলা। সুরুজ মিয়া ভেতরে ঢুকেই থমকে গেলেন। মেঝের ওপর পড়ে আছে তাঁর কলিজার টুকরো, সুলতানার নিথর দেহ। গাল বেয়ে রক্ত ঝড়ছে, গলায় কালচে দাগ।
চিৎকার দিয়ে সুরুজ মিয়া মেয়ের ওপর আছড়ে পড়লেন। রাহেলা বেগমও কাজ থেকে ফিরে এই দৃশ্য দেখে জ্ঞান হারালেন। মুহূর্তের মধ্যে পুরো গ্রাম ভেঙে পড়লো সুরুজ মিয়ার উঠোনে। চারদিকের মানুষ ডুকরে কেঁদে উঠলো। শিক্ষকরা এসে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন—কাকে তারা এত ভালোবাসতেন, কার ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন!
একটু আগেই যে বাবা মেয়ের জন্য আনন্দের রঙিন জামা কিনে এনেছিলেন, এখন তাঁকে কিনতে হচ্ছে মেয়ের নিথর দেহটা ঢাকার জন্য এক টুকরো সাদা কাফনের কাপড়। সুরুজ মিয়া ডুকরে কেঁদে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে বলতে লাগলেন, "ও আল্লা, আমি তো মেয়েরে মানুষ করার স্বপ্ন দেখছিলাম! আমার রঙিন জামা পইরা আমার মা খালার বাড়ি যাওয়ার কথা আছিলো, সে এখন সাদা কাপড় পইরা কবরে যাইবো কেন?"
চারদিকে প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিবাদের সেই উত্তাল ঢেউ যেনো স্তিমিত হয়ে এলো। প্ল্যাকার্ডগুলো রোদে পুড়ে রঙচটা হয়ে গেলো। অদৃশ্য কোনো ক্ষমতাবান হাতের ইশারায় বিচারের ফাইলটা চাপা পড়ে গেলো আইনি মারপ্যাঁচে। এক বুক হাহাকার নিয়ে, বেঁচে থাকার তাগিদে সুরুজ মিয়াকে আবার নামতে হলো পথে। ক্ষুধার রাজ্যে তো শোকেরও ছুটি থাকে না। দু মুঠো ভাতের জোগাড় করতে আবারও সেই পুরনো বাঁকটা কাঁধে তুলে নিলেন কিন্তু এখন আর তাঁর ডাকে সেই চটুল সুর নেই, সেখানে কেবলই এক ক্লান্ত বাবার দীর্ঘশ্বাস। দিন যায়, মাস যায়। আদালতপাড়ায় কেবল ‘তারিখের পর তারিখ’ পড়তে থাকে। খুনি ঝন্টু রানার পরিবার চড়া গলায় কথা বলে, আর সুরুজ মিয়া আদালতের বারান্দায় এক কোণে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে থাকেন।
সেদিন দুপুরে সুরুজ মিয়া সবেমাত্র বাড়ি ফিরেছেন। উঠোনে পা দিতেই দেখলেন, সুলতানার স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোস্তাক সাহেবসহ কয়েকজন শিক্ষক এবং এক অপরিচিত যুবক তাঁর ভাঙা ঘরে বসে আছেন। শিক্ষকের চোখে আনন্দ আর বিষাদের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। সুরুজ মিয়াকে দেখেই প্রধান শিক্ষক জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন, "সুরুজ মিয়া, তোমার মেয়েটা আমাদের মুখ উজ্জ্বল করছে। সুলতানা ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাইছে! পুরো উপজেলায় সে প্রথম হইছে।"
খবরটা শুনে সুরুজ মিয়া পাথর হয়ে গেলেন। যার ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার কথা ছিলো, সে আজ মাটির নিচে ঘুমাচ্ছে, আর তার মেধার স্বীকৃতি আজ পত্রিকার পাতায়। সুরুজ মিয়ার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়তে লাগলো।
সাথে থাকা সেই তরুণ যুবকটি ছিলেন ঢাকার এক নামকরা পত্রিকার নির্ভীক সাংবাদিক, নাম আহসান হাবীব। সুলতানার এই অভাবনীয় ফলাফলের খবর শুনে তাঁর বুকটা কেঁপে উঠেছিলো। তিনি সুরুজ মিয়ার সেই লাল জামা আর সুলতানার বৃত্তির সার্টিফিকেটের ছবি তুললেন। পরদিন পত্রিকার প্রথম পাতায় বিশাল শিরোনামে খবর ছাপা হলো:
"ট্যালেন্টপুলে উপজেলায় প্রথম হয়েও যে ছাত্রী কবরে: খুনি ঝন্টুর বিচার কি টাকা আর ক্ষমতায় আটকে থাকবে?"
টেলিভিশন টকশো আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবার আগুন জ্বলে উঠলো। সারা দেশ ধিক্কার দিয়ে উঠলো প্রশাসনকে। সাময়িকভাবে টনক নড়লো ওপর মহলের। উপর মহল থেকে নির্দেশ এলো—মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেওয়া হোক।
কিন্তু... নির্মম বাস্তবতা দেশজুড়ে আবার আলোড়ন তৈরি হলো ঠিকই, কিন্তু... আমাদের সমাজের চাকা তো বড্ড নিষ্ঠুর আর ক্ষণস্থায়ী। কদিন পরই দেশের রাজনীতি, কোনো এক সেলিব্রেটির বিয়ে কিংবা নতুন কোনো রোমাঞ্চকর ঘটনা এসে সুলতানার খবরটাকে পেছনের পাতায় ঠেলে দিলো। জনতা মেতে উঠলো নতুন কোনো ট্রেন্ড নিয়ে।
আইনের দীর্ঘসূত্রতা আর টাকার জোরের কাছে সাংবাদিক আহসান হাবীবের লড়াইটাও একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়লো। ঝন্টু রানার পরিবার টাকার জোরে সাক্ষীদের ভয় দেখাতে শুরু করলো। গরিব সুরুজ মিয়ার পক্ষে দিনের পর দিন আদালতে গিয়ে হাজিরা দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। অবশেষে, ঘটনার দুই বছর পর আদালত রায় দিলো—"সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে এবং অস্পষ্টতার কারণে আসামি ঝন্টু রানা খালাস।"
জেল থেকে বীরদর্পে বেরিয়ে এলো খুনি ঝন্টু রানা। তার মুখে তখন কুৎসিত বিজয়ের হাসি।
অসহায় সুরুজ মিয়া সন্ধ্যায় তাঁর মেয়ের কবরের কাছে গিয়ে বসলেন। পাশে এখনো পড়ে আছে সুলতানার সেই ট্যালেন্টপুলে বৃত্তির সনদ আর মলিন হয়ে যাওয়া লাল জামাটা।
সুরুজ মিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে হাত দুটো তুলে বললেন, এই পৃথিবীর আদালত হয়তো টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেছে, কিন্তু উপরের সেই পরম বিচারকের আদালত তো বিক্রি হয় না, মা।
তিনি ভাঙা গলায় বললেন, "মা রে, তোর বাজান হেরে গেছে। এই দুনিয়ার মানুষ দরিদ্র অসহায় মানুষের বিচার করে না রে মা, এরা শুধু লাশের রাজনীতি করে। তুই খোদার কাছে বিচার চাস মা, খোদার কাছে বিচার চাস..."
মন্তব্য করুন