Advertisement
রবিবার, 13 সেপ্টেম্বর 2026
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ
সার নিয়ে কৃষক-ডিলারদের জন্য মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশনা এসএসসির আগে ‘পরীক্ষা’, মেহেরপুরে ৫ হাজার ৭৫৬ শিক্ষার্থীর মডেল টেস্ট বগুড়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার-৯ পদ্মায় নৌকাডুবি: বিএসএফের উদ্ধার ১০ বাংলাদেশিকে ফেরাল ৫৩ বিজিবি তিতাসের বুকে নৌকাবাইচ, দুই পাড়ে হাজারো মানুষের ঢল নকলায় নারীদের দক্ষতা উন্নয়নে ‘নৈপুণ্য কুটির শিল্প’ প্রশিক্ষণ সেন্টারের উদ্বোধন শেরপুরে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ: ঝিনাইগাতীকে হারিয়ে সদর উপজেলা জয়ী সারাদেশে হাম উপসর্গে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ৮৫৫ বিদেশে পড়াশোনার যত সুবিধা বাংলাদেশে ব্রিটিশ আইন শিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা

অভাবের কাছে হারেনি ভালোবাসা, স্ত্রীকে কোলে নিয়েই সাজুর জীবন

অভাবের কাছে হারেনি ভালোবাসা, স্ত্রীকে কোলে নিয়েই সাজুর জীবন
News Banner

জীবনযুদ্ধে কখনো দারিদ্র্যের কাছে মানুষ হার মানে, আবার কখনো ভালোবাসা আর মমতার কাছে হার মানে দারিদ্র্যও। শেরপুরের খুনুয়া চরপাড়া গ্রামের বৃদ্ধ সাজু শেখ ও নুরজাহান বেগমের জীবন যেন সেই ভালোবাসারই এক অনন্য উদাহরণ। অভাব, অসুস্থতা, শারীরিক অক্ষমতা আর বার্ধক্য—সবকিছুকে পেছনে ফেলে প্রায় সাত দশক ধরে একে অপরের পাশে আছেন তারা। বৃদ্ধ সাজু শেখের বয়স ৮৬ বছর। আর তাঁর স্ত্রী নুরজাহান বেগমের বয়স ৮০ বছর। বয়সের ভারে দুজনের শরীরই নুয়ে পড়েছে। পাঁচ বছর ধরে শয্যাশায়ী নুরজাহান। নিজে ঠিকমতো চলাফেরা করতে না পারলেও স্ত্রীকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ছেড়ে যাননি সাজু শেখ।

প্রায় ৭০ বছর আগে বিয়ে হয় সাজু শেখ ও নুরজাহানের। বিয়ের পর থেকে শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামে সাজু শেখের পৈতৃক ভিটায় সংসার শুরু করেন তারা। সংসারে অভাব ছিল, তবে ভালোবাসার কমতি ছিল না। কাঁচামালের ব্যবসা করে কোনোরকমে চলত তাদের সংসার। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে তাদের ঘরে আসে তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। তিন মেয়েরই বিয়ে হয়েছে অনেক আগে। কেউ কেউ মাঝে মধ্যে বাবার খোঁজ নেন। তিন ছেলের একজন করোনাকালে নিখোঁজ হয়ে গেলেও মাঝে মাঝে খোঁজখবর নেন। আরেক ছেলে ঢাকায় রিকশা চালান; তিনিও বছরে এক-দুবার বাড়িতে আসেন। শেরপুরে থাকা অপর ছেলে নুর ইসলাম দিনমজুরি ও ঠেলাগাড়ি চালিয়ে যতটা সম্ভব বৃদ্ধ মা-বাবার দেখাশোনা করেন।

তবে নুর ইসলামের নিজের সংসারেও অভাব নিত্যসঙ্গী। কয়েক বছর আগে চিকিৎসার অভাবে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তাঁর স্ত্রী মারা গেছেন। ফলে বৃদ্ধ মা-বাবার চিকিৎসা ও ভরণপোষণের দায়িত্বও ঠিকমতো পালন করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রায় পাঁচ বছর আগে পা পিছলে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় নুরজাহানের। এরপর থেকেই তিনি শয্যাশায়ী। অর্থের অভাবে উন্নত চিকিৎসাও করাতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা। ধীরে ধীরে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। অন্যদিকে, বয়সের ভারে সাজু শেখও এখন আর সোজা হয়ে হাঁটতে পারেন না। কানে কম শোনেন। জোরে কথা না বললে অনেক কিছুই বুঝতে পারেন না। তারপরও স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসায় কোনো কমতি নেই তাঁর।

প্রতিদিন সকালে কাঁপা হাতে স্ত্রীকে কোলে তুলে ঘরের বাইরে উঠানে নিয়ে আসেন সাজু শেখ। সেখানে চটি বিছিয়ে স্ত্রীকে শুইয়ে দেন। এরপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁর পাশে বসে থাকেন। স্ত্রী কথা বলতে না পারলেও ইশারায় অনেক কিছু বুঝিয়ে দেন। আর কানে কম শোনা সাজু শেখও যেন সেই ইশারার ভাষা বুঝে নেন। স্ত্রীর প্রস্রাব-পায়খানা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব কাজই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী করেন সাজু শেখ। ভাঙা শরীর, কাঁপা হাত আর অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে বৃদ্ধ বয়সেও স্ত্রীকে সেবা করে যাচ্ছেন তিনি।

স্থানীয়রা জানান, কখনো কখনো কাজের সন্ধানে বাড়ির পাশের খুনুয়া বাজারে যান সাজু শেখ। কিন্তু কঙ্কালসার শরীর আর বয়সের ভার দেখে তাঁকে কাজ দিতে চান না কেউ। কিছুক্ষণ বাজারে ঘুরে আবার ফিরে আসেন স্ত্রীর কাছে। অভাবের সংসারে খাবার জোটে না ঠিকমতো। চিকিৎসার সামর্থ্য নেই। তবুও স্ত্রীকে ছেড়ে কোথাও যেতে চান না সাজু শেখ। কখনো কখনো কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন—তাদের দুজনকে যেন একসঙ্গে নিয়ে যান।

গত ৯ সেপ্টেম্বর ঘরের দরজার সামনে স্ত্রীকে কোলে নিয়ে এমনই এক হৃদয়বিদারক আকুতি জানান সাজু শেখ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলতে থাকেন, “আল্লাহ, আমাকে খাবার দাও। আমার স্ত্রীকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি।”

স্থানীয় এক ব্যক্তি বৃদ্ধ দম্পতির এই অসহায় মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নজরে আসে শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিনের। পরে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা বিনতে রফিক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুল হাসান ওই বৃদ্ধ দম্পতির বাড়িতে যান। তারা দুই মাসের খাদ্যসামগ্রী, বৃদ্ধ দম্পতির পরনের কাপড়, কম্বল ও নগদ অর্থ দিয়ে আসেন।

একই সঙ্গে প্রতি মাসে ওই দম্পতির খাবারের দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা বিনতে রফিক। তিনি ছেলে নুর ইসলামকে প্রতি মাসে তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে মা-বাবার জন্য খাদ্যসামগ্রী নিয়ে আসতে বলেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

এদিকে, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি দেখে শুক্রবার গভীর রাতে শেরপুরের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রক্তসৈনিক বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন-এর সদস্যরাও ওই বৃদ্ধ দম্পতির বাড়িতে ছুটে যান। তারা বৃদ্ধ দম্পতির খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি খাদ্যসামগ্রী ও নতুন পোশাক উপহার দেন।

দারিদ্র্য তাদের নিত্যসঙ্গী। বার্ধক্য কেড়ে নিয়েছে শরীরের শক্তি, অসুস্থতা কেড়ে নিয়েছে স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু এত কিছুর পরও একে অপরের হাত ছাড়েননি সাজু শেখ ও নুরজাহান। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাদের কাছে হয়তো অর্থ-বিত্তের কোনো মূল্য নেই। একে অপরের পাশে থাকাটাই যেন তাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তাই অভাবের কাছে হার না মেনে সাত দশকের ভালোবাসা নিয়েই তারা আজও পাশাপাশি- যেন ভালোবাসার কাছে সত্যিই হার মেনেছে দারিদ্র্য। 

এই সংবাদটি পঠিত হয়েছে: 11 বার

মেহেদী হাসান শামীম

বার্তা সম্পাদক

এই সাংবাদিকের মোট খবর: 14 টি

মন্তব্য করুন