ছোটবেলায় রং পেন্সিল হাতে নিয়ে খাতার পাতায় ইচ্ছেমতো রং করার আনন্দ নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। ফুলের পাপড়ি নীল, আকাশ গোলাপি কিংবা গাছের পাতা সবুজের বদলে অন্য কোনো রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার সেই স্বাধীন আনন্দ ছিল একেবারেই আলাদা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো হারিয়ে গেছে রঙের খাতা, কিন্তু বেড়েছে জীবনের নানা ব্যস্ততা, দুশ্চিন্তা আর মানসিক চাপ।
কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব, ব্যক্তিগত নানা ভাবনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবিরাম ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে নিজের জন্য একটু সময় বের করাই অনেকের কাছে কঠিন হয়ে উঠেছে। অথচ এই ব্যস্ততার মাঝেই কয়েক মিনিটের জন্য রং পেন্সিল হাতে বসে পড়া হতে পারে মনকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার একটি সহজ ও সৃজনশীল উপায়।
রং করলে মন শান্ত হয় কেন?
রং করার সময় একজন মানুষ নির্দিষ্ট একটি কাজের দিকে মনোযোগ দেন। কোন জায়গায় কোন রং ব্যবহার করবেন, কীভাবে নকশাটি সাজাবেন কিংবা কোন রঙের সঙ্গে কোন রং মানাবে—এসব নিয়ে ভাবতে গিয়ে মস্তিষ্ক সাময়িকভাবে অন্য চিন্তা থেকে মনোযোগ সরিয়ে একটি সৃজনশীল কাজে কেন্দ্রীভূত হয়।
মনোবিজ্ঞান ও শিল্পভিত্তিক থেরাপি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড অনেক মানুষের ক্ষেত্রে আবেগ প্রকাশ এবং মানসিক চাপ সামলানোর সহায়ক উপায় হতে পারে। তবে রং করাকে কোনো মানসিক রোগের চিকিৎসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কিছু গবেষণাতেও রং করার সঙ্গে উদ্বেগ কম অনুভব করার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে থাকা কিছু রোগীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, রং করার কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পর তারা নিজেদের উদ্বেগ কিছুটা কম অনুভব করেছেন। গবেষকদের ধারণা, এ ধরনের সৃজনশীল কাজ সাময়িকভাবে মনোযোগকে দুশ্চিন্তা থেকে সরিয়ে অন্য একটি কাজে কেন্দ্রীভূত করতে পারে।
‘মাইন্ডফুল অ্যাক্টিভিটি’ হিসেবে রং
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় রং করাকে ‘মাইন্ডফুল অ্যাক্টিভিটি’ বা সচেতনভাবে কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়ার একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ অতীতের ঘটনা কিংবা ভবিষ্যতের আশঙ্কায় ডুবে না থেকে বর্তমান মুহূর্তে যে কাজটি করছেন, সেদিকেই মনোযোগ দেওয়া।
২০১৮ সালের একটি গবেষণাতেও রং করার সঙ্গে উদ্বেগ কমার সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়। বিশেষ করে সচেতন মনোযোগের সঙ্গে রং করার ক্ষেত্রে কিছু উপকারী প্রভাব লক্ষ্য করা হয়েছিল। তবে গবেষণার ফল সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়। কারও কাছে রং করা আনন্দদায়ক ও স্বস্তিদায়ক হতে পারে, আবার কেউ এতে তেমন আগ্রহ নাও পেতে পারেন।
কীভাবে শুরু করবেন?
রং করার জন্য বিশেষ কোনো দক্ষতার প্রয়োজন নেই। একটি খাতা, রং পেন্সিল, ক্রেয়ন কিংবা জলরং—হাতে যা আছে, তা দিয়েই শুরু করা যায়। ফুল, পাতা, প্রকৃতির দৃশ্য, ম্যান্ডালা, জ্যামিতিক নকশা কিংবা পছন্দের যেকোনো ছবি বেছে নিতে পারেন। প্রথম দিনেই নিখুঁত ছবি আঁকার চেষ্টা না করে ১৫ থেকে ২০ মিনিট নিজের মতো করে রং করার অভ্যাস করুন। মনে রাখবেন, ছবির আকাশ নীলই হতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। ইচ্ছা হলে আকাশ গোলাপি হতে পারে, গাছের পাতা হতে পারে বেগুনি কিংবা ফুলের পাপড়িতে মিশে যেতে পারে একাধিক রং। এখানে মূল বিষয় সুন্দর ছবি তৈরি করা নয়; বরং নিজের সৃজনশীলতাকে কিছুটা সময় দেওয়া।
রং করার সময় যা খেয়াল রাখবেন
রং করার সময় মোবাইল ফোনের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখতে পারেন। টেলিভিশন কিংবা অন্য কোনো বিভ্রান্তি এড়িয়ে শান্ত পরিবেশ বেছে নেওয়া ভালো। ধীরে ধীরে রং করুন এবং নিজের কাজের সঙ্গে অন্যের কাজের তুলনা করবেন না। চাইলে একা না বসে সন্তান, বন্ধু কিংবা সঙ্গীকেও সঙ্গে নিতে পারেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে রং করার আয়োজন আনন্দের পাশাপাশি একটি সুন্দর সামাজিক কর্মকাণ্ডেও পরিণত হতে পারে।
সপ্তাহে অন্তত একদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট নিজের পছন্দের কোনো সৃজনশীল কাজে সময় দেওয়া যেতে পারে। রং করা হতে পারে সেই তালিকারই একটি সহজ উপায়। ব্যস্ত জীবনের মধ্যে কয়েক মিনিটের এই বিরতি মনকে কিছুটা হালকা করার সুযোগ দিতে পারে।
তবে কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ জরুরি?
রং করা মানসিক চাপ সামলানোর একটি সহায়ক ও আনন্দদায়ক কর্মকাণ্ড হতে পারে, কিন্তু এটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার চিকিৎসার বিকল্প নয়। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা কিংবা মানসিক অস্বস্তির কারণে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হলে শুধু রং করা বা অন্য কোনো স্ব-সহায়ক কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর না করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
তাই অনেক দিন পর বের করে আনতে পারেন ছোটবেলার সেই রং পেন্সিলের বাক্সটি। একটি সাদা খাতা আর কয়েকটি রং দিয়েই শুরু হোক নিজের জন্য কিছুটা সময়। ছবিটি কতটা সুন্দর হলো, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো—রং করার সেই কয়েক মিনিটে আপনি কতটা নিজের কাছে ফিরতে পারলেন।
মন্তব্য করুন