জন্মগত বাকপ্রতিবন্ধকতা থামাতে পারেনি স্বপ্নের পথচলা। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে সম্পন্ন করেছেন স্নাতক (সম্মান), গড়ে তুলেছেন নিজের বাটিক ও বুটিক প্রতিষ্ঠান। এবার যুক্ত হয়েছেন শিক্ষকতা পেশায়। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রমে নিজের পরিচয় গড়ে তোলা শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার মেয়ে সুইটি আক্তার মুন্নির এই পথচলা এখন অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা।
সুইটি আক্তার মুন্নি টাঙ্গাইলের পাকুটিয়া এলাকার অক্সফোর্ড কিন্ডারগার্টেনে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। সেখানে তিনি চারুকলা বা চিত্রাঙ্কন বিষয়ে পাঠদান করবেন।
মুন্নি শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার আব্দুল মালেক ও সুফিয়া বেগম দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে সবার বড়। তাঁর বাবা আব্দুল মালেক একজন পুলিশ কনস্টেবল। বর্তমানে তিনি ঘাটাইল থানায় কর্মরত। মা সুফিয়া বেগম গৃহিণী।
মুন্নির শিক্ষাজীবন শুরু হয় একটি বিশেষায়িত বিদ্যালয়ে। সেখানে পড়ার সময় ছবি আঁকার প্রতি তাঁর আগ্রহ লক্ষ করেন মা-বাবা। পরে মায়ের উদ্যোগে তাঁকে একটি আর্ট কোচিংয়ে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ‘চিত্রণ আর্ট স্কুল’ নামে পরিচিত। সেখান থেকেই ছবি আঁকার চর্চা শুরু তাঁর।
পঞ্চম শ্রেণিতে একই শ্রেণির পাঠ্যবই পুনরায় দেওয়ায় ওই বিদ্যালয়ে পড়তে আগ্রহ হারান মুন্নি। পরে তাঁকে উইজডম ভ্যালি স্কুলে ভর্তি করানো হয়। সেখানে ভর্তি হতেও নানা বাধা পেরোতে হয়। ওই বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ঘাটাইল গণপাইলট সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।উচ্চমাধ্যমিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পড়ার সময় রতন আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়ে ছবি আঁকার প্রশিক্ষণ নেন। পরে ইবরাহীম খাঁ সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করেন।
পড়াশোনার পাশাপাশি ছবি আঁকার দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন মুন্নি। স্নাতক (সম্মান) পড়ার সময় শাড়ি, পাঞ্জাবিসহ বিভিন্ন পোশাকে নকশা ও চিত্র আঁকার কাজ শুরু করেন। ছোট পরিসরে শুরু করা সেই উদ্যোগই ধীরে ধীরে তাঁর ব্যবসায়িক পরিচয় তৈরি করে। বর্তমানে নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন একটি বাটিক ও বুটিক কারখানা।
নিজের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প জানিয়ে মুন্নি বলেন, ‘অনার্সে থাকাকালীন ছোট একটি ব্যবসা শুরু করি। শাড়ি, পাঞ্জাবিসহ বিভিন্ন কাপড়ে আর্টের কাজ করতাম। তখন পরিবারের কেউ তেমন সাহস পাননি। তাঁদের ধারণা ছিল, হয়তো আমি বেশি দূর যেতে পারব না। কিন্তু নিজের আত্মবিশ্বাস থেকে পরিবারকে জানাই, আমি ব্যবসা করব। এভাবেই ছোট একজন উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরু করি।’
নিজের বলার মতো একটা গল্প ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ইকবাল বাহার জাহিদের অনুপ্রেরণা তাঁর এগিয়ে চলার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জানান মুন্নি। তবে সবচেয়ে বেশি সাহস ও অনুপ্রেরণা পেয়েছেন মায়ের কাছ থেকে। মুন্নি বলেন, ‘আমার মা সব সময় চাইতেন, নিজের একটি পরিচয় তৈরি করে যেন সবার সামনে গর্বের সঙ্গে দাঁড়াতে পারি। কারও ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের যোগ্যতায় এগিয়ে যেতে পারি। সামাজিক বাধা যেন আমাকে দমিয়ে রাখতে না পারে, সে জন্য মা সব সময় সাহস দিয়েছেন।’
সম্প্রতি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হওয়ার খবর জানাতে ইবরাহীম খাঁ সরকারি কলেজে গিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করেন মুন্নি। তাঁর অর্জন ও অধ্যবসায়ে মুগ্ধ হন শিক্ষকেরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে দেওয়া এক শিক্ষকের পোস্টেও উঠে আসে তাঁর শিক্ষাজীবন, সৃজনশীলতা ও উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প। ওই শিক্ষক মুন্নির সাফল্য কামনা করে লেখেন, ‘জয় হোক তোমার ইচ্ছাশক্তির।’
মুন্নির মা সুফিয়া বেগম বলেন, ‘আমার মেয়ে ছোটবেলা থেকেই কথা বলতে পারে না। তবে কখনো তার ইচ্ছাশক্তি ও স্বপ্নের কাছে হার মানতে দেখিনি। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও সে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। নিজের চেষ্টায় অনার্স শেষ করেছে। পাশাপাশি ছবি আঁকা ও নিজের কাজের মাধ্যমে একটি অবস্থান তৈরি করেছে। এখন শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়েছে, এতে একজন মা হিসেবে আমি অনেক আনন্দিত ও গর্বিত। আমি চাই, আমার মেয়ে জীবনে আরও এগিয়ে যাক, নিজের যোগ্যতায় মানুষের ভালোবাসা অর্জন করুক। সবাই আমার মেয়ের জন্য দোয়া করবেন।’
নিজের জীবনদর্শন ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা তুলে ধরে সুইটি আক্তার মুন্নি বলেন, ‘আমি মনে করি, শারীরিক বাধা অতিক্রম করার দৃঢ় মনোভাব থাকলে এবং আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রেখে কঠোর পরিশ্রম করলে কারও সফলতা আটকে রাখা সম্ভব নয়, ইনশা আল্লাহ। আমি আরও ভালো অবস্থানে যেতে চাই, যেন আমাকে সবাই চেনে। নিজের পাশাপাশি সমাজের জন্যও আরও কিছু করতে চাই।’
সুইটি আক্তার মুন্নির জীবনসংগ্রাম ও সাফল্য প্রমাণ করে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা স্বপ্নপূরণের পথে চূড়ান্ত বাধা নয়। আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিজের পরিচয় গড়ে তোলা সম্ভব।
মন্তব্য করুন