ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। গারো পাহাড়ের নীরবতা ভেঙে একে একে বাগানে ঢুকছেন শ্রমিকেরা। সারি সারি রাবারগাছের গায়ে বসানো ছোট ছোট পাত্র। গাছের গায়ে বিশেষ কায়দায় কাটা দাগ থেকে টুপটাপ করে পাত্রে জমছে সাদা কষ।
একেকটি ফোঁটা যেন পাহাড়ি জনপদের অর্থনীতিতে সম্ভাবনার একেকটি গল্প।
ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা শেরপুরের ঝিনাইগাতীর সন্ধ্যাকুড়া এলাকার ‘জিএস রাবার প্রকল্পে’ প্রতিদিন এমন দৃশ্যই দেখা যায়। প্রায় ৮০ একর পাহাড়ি জমিতে গড়ে ওঠা এই বাগানে এখন রয়েছে প্রায় আট হাজার রাবারগাছ। এর মধ্যে প্রায় সাত হাজার গাছ থেকে নিয়মিত কষ সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ১৮০ থেকে ২০০ কেজি কষ উৎপাদন হচ্ছে। বছরে বাজারজাত করা হয় প্রায় ৬০ টন রাবার। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও কার্যকর বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এই রাবার বাগান শুধু একটি উৎপাদনকেন্দ্র হয়ে থাকবে না; এটি বদলে দিতে পারে সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি জনপদের অর্থনীতির চিত্র। বাড়তে পারে কর্মসংস্থান। তৈরি হতে পারে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ। রাবার বাগান ঘিরে বিকশিত হতে পারে পর্যটনও।
৩৭ বছর ধরে পাহাড়ে রাবারের চাষ:
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার উত্তরে মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড়ে ১৯৮৯ সালে রাবার বাগান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইদ্রিস গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত ইদ্রিস মিয়া প্রায় ৮০ একর জমিতে এ উদ্যোগ নেন।
দীর্ঘদিনের পরিচর্যায় বাগানের গাছগুলো এখন উৎপাদনক্ষম। বর্তমানে প্রায় সাত হাজার গাছ থেকে নিয়মিত কষ সংগ্রহ করছেন শ্রমিকেরা। ভোরে সংগ্রহ করা কষ পরে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরপর তা দেশের বিভিন্ন বাজারে পাঠানো হয়।
ফোঁটা ফোঁটা কষ, বড় অর্থনীতি:
রাবারগাছের কষ দেখতে সাদাটে। গাছের বাকলে বিশেষভাবে কাটা দাগ দিয়ে কষ বের করে ছোট পাত্রে জমা করা হয়। পরে তা সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
প্রকল্পে ম্যানেজার ও সহকারী ম্যানেজারসহ ১৬ জন কর্মচারী রয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিদিন স্থানীয় কয়েকজন শ্রমিকও বাগানে কাজ করেন। তাঁদের অনেকের জীবিকার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে গেছে এই রাবার বাগান।
বাগানের শ্রমিক মো. জৈমত আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাবারগাছ থেকে কষ সংগ্রহের কাজ করছেন তিনি। এই কাজের আয় দিয়েই চলে তাঁর সংসার। বাগানের উৎপাদন ও কার্যক্রম বাড়ানো গেলে স্থানীয় মানুষের কাজের সুযোগও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।
সম্ভাবনার সঙ্গে আছে সংকটও:
রাবার উৎপাদনে সম্ভাবনা থাকলেও বাজার নিয়ে রয়েছে উদ্বেগ। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, বিদেশি রাবার বাজারে আসায় দেশীয় উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতায় চাপে পড়ছেন। পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরকারি সহায়তার ঘাটতির কারণেও দেশের রাবারশিল্প কাঙ্ক্ষিতভাবে এগোতে পারছে না।
জিএস রাবার প্রকল্পের কোষাধ্যক্ষ মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বাগান থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৮০ থেকে ২০০ কেজি কষ সংগ্রহ করা হয়। তবে বিদেশি রাবার বাজারে আসায় দেশীয় রাবারের বাজার কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারি সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও ভালো বাজার ব্যবস্থাপনা পাওয়া গেলে এই শিল্প আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।’
রাবারের সঙ্গে পর্যটনের হাতছানি:
শুধু রাবার উৎপাদন নয়, গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও এই প্রকল্পের বাড়তি সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সারি সারি রাবারগাছ, সবুজ পাহাড়, সীমান্তবর্তী পরিবেশ এবং গাছ থেকে কষ সংগ্রহের দৃশ্য—সব মিলিয়ে জায়গাটি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইদ্রিস গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোতাসিম বিল্লাহ আরিফ বলেন, ‘জিএস রাবার প্রকল্পটি আমাদের কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের একটি স্বপ্নের প্রকল্প ছিল। বর্তমানে এ রাবার বাগানে উৎপাদন ভালো হচ্ছে। তবে বাজারে বিদেশি রাবার প্রবেশ করায় গুণগতমানসম্পন্ন এই রাবার বাজার হারিয়েছে। সরকারের নজরদারি ও সহযোগিতা পেলে এই রাবার থেকে লাভের মুখ দেখা সম্ভব।’
শেরপুরের ওয়াইল্ডলাইফ রেঞ্জার মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, ‘এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ খুবই সুন্দর। রাবার আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ দেখার সুযোগের পাশাপাশি পাহাড়ি প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে পর্যটনকেন্দ্র করা গেলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান আরও বাড়বে। রাবার বাগানটি স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’
বদলে যেতে পারে পাহাড়ি জনপদের চিত্র
সীমান্তঘেঁষা ঝিনাইগাতীর পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর নানা উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে। সেই বাস্তবতায় রাবার বাগানটি হতে পারে স্থানীয় অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় খাত।
প্রতিদিন গাছ থেকে ঝরে পড়া শত শত কেজি কষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রমিকদের জীবিকা, উদ্যোক্তার বিনিয়োগ এবং একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সুষ্ঠু বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পাহাড়ের এই সাদা কষই একদিন হয়ে উঠতে পারে বহু মানুষের জীবিকার শক্ত ভিত্তি।
গারো পাহাড়ের সবুজ বুকজুড়ে সারি সারি রাবারগাছ তাই শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়—প্রতিটি গাছ যেন সম্ভাবনার একটি করে স্তম্ভ। আর প্রতিটি কষের ফোঁটা বলছে, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পাহাড়ের অর্থনীতিও বদলে যেতে পারে।
মন্তব্য করুন