মাঠজুড়ে এখন সোনালি আঁশের ব্যস্ততা। কোথাও কৃষক পাট কাটছেন, কোথাও আঁটি বেঁধে পানিতে জাগ দিচ্ছেন। আবার কোথাও জাগ দেওয়া পাট থেকে আঁশ ছাড়িয়ে রোদে শুকানো হচ্ছে। জলাশয়ের পাড়ে বাঁশ ও কাঠের তৈরি আড়ায় ঝুলছে সদ্য ছাড়ানো পাটের আঁশ। পাশে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে পাটখড়ি। পাটের মৌসুমি কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শেরপুরের কৃষক-কৃষাণীরা।
একসময় জেলায় পাট চাষে আগ্রহ তুলনামূলক কম থাকলেও উৎপাদন বৃদ্ধি, অনুকূল আবহাওয়া এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশায় আবারও পাট চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। ফলে সোনালি আঁশকে ঘিরে নতুন করে সম্ভাবনা দেখছেন কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে শেরপুর জেলায় ১ হাজার ৯১১ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ১ হাজার ৯১২ হেক্টর জমিতে। এসব জমি থেকে প্রায় ৪ হাজার ১৫ মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ জমির পাট কাটা শেষ হয়েছে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর প্রতি বিঘায় গড়ে ১০ থেকে ১২ মণ পাট উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি বিঘায় পাট চাষে খরচ হয় প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। বাজারদর অনুকূলে থাকলে প্রতি বিঘায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত মুনাফা হতে পারে। এর সঙ্গে পাটখড়ি বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন কৃষকরা। প্রতি আঁটি পাটখড়ি ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে।
ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে পাটের কেনাবেচা জমে উঠেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছ থেকে পাট কিনে তা দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠাচ্ছেন। বাজারে চাহিদা থাকায় উৎপাদিত পাটের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী কৃষি বিভাগ।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, পাটের মৌসুমে মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে উৎপাদন খরচের তুলনায় প্রত্যাশিত দাম না পেলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই পাটের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে বাজারে সরকারি নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
শেরপুর সদর উপজেলার কামারেরচরের সাহাব্দির চরের পাটচাষি কাদের মিয়া বলেন, “এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাটের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। রোগবালাইও তুলনামূলক কম ছিল। প্রতি বিঘায় আগের বছরের চেয়ে বেশি পাট পেয়েছি। বাজারে ন্যায্য দাম পেলে এ বছর আমরা বেশ লাভবান হতে পারব।”
সদর উপজেলার চরমোচারিয়া ইউনিয়নের মুন্সিরচর গ্রামের পাটচাষি সাইদুর রহমান বলেন, “এবার পাটের ফলন যেমন ভালো হয়েছে, তেমনি আঁশের মানও ভালো হয়েছে। সময়মতো বৃষ্টি পাওয়ায় সেচ খরচও কমেছে। তবে উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা গেলে কৃষকরা আগামীতে আরও বেশি পাট চাষে আগ্রহী হবেন।”
চরশেরপুর ইউনিয়নের বাঘেরচর গ্রামের পাটচাষি মো. কামারুজ্জামান লাল মিয়া বলেন, “আমি প্রতিবছরই পাট চাষ করি। এ বছর জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে ভালো মানের পাট সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৫০০ টাকা মণ এবং মোটামুটি মানের পাট ৩ হাজার ৯০০ থেকে ৪ হাজার ১০০ টাকা মণ দরে কেনাবেচা হচ্ছে।”
শেরপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসলিমা খানম নীলু বলেন, “চলতি বছর পাটের চাষ বৃদ্ধিতে জেলা পাট অধিদপ্তর থেকে প্রায় ৮ হাজার কৃষকের মধ্যে কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ১ কেজি করে পাটবীজ বিতরণ করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “পাট পরিবেশবান্ধব হওয়ায় বাংলাদেশে এর বহুমুখী ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এর ফলে দেশ ও বিদেশে পাটের চাহিদাও বাড়ছে। ভালো মূল্য পাওয়ায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন এবং পাট চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।”
কৃষকদের প্রত্যাশা, বাজারে পাটের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি সহযোগিতা অব্যাহত রাখা গেলে শেরপুরে পাট চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে। এতে একদিকে কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব এই ফসলের হাত ধরে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসতে পারে।
মন্তব্য করুন