শেরপুরে সবজি উৎপাদনে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার মাঠজুড়ে এখন শোভা পাচ্ছে নানা জাতের শীতকালীন ও আগাম সবজি। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব সবজি যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে। কৃষকদের আশা, চলতি মৌসুমে জেলায় উৎপাদিত সবজির বাজারমূল্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। এতে কৃষকের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনুকূল আবহাওয়ায় চলতি মৌসুমে সবজির ফলন ভালো হয়েছে। শেরপুর সদর, ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকভাবে সবজি চাষ হচ্ছে। সদর উপজেলার লছমনপুর ইউনিয়নের কুসুমহাটি গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে কৃষির এ পরিবর্তন।
জেলার চরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকার জমিতে পেঁপে, আলু, বেগুন, টমেটো, বরবটি, ঝিঙে, চায়না মুলা, লালশাক, বাঁধাকপি, মরিচসহ বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ করছেন কৃষকরা।পাশাপাশি কচুখেত, সবজিকুঁড়া, হলদিয়াপাড়া, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন নতুন সবজি আবাদে আগ্রহ বাড়ছে।
কৃষকদের ভাষ্য, উৎপাদন ভালো হওয়ায় এবার বাজারেও ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। কুসুমহাটি গ্রামের কৃষকরা জানান, লাউ প্রতি পিস ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং বেগুন ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে পাইকারি বিক্রি করছেন।
টমেটোসহ অন্যান্য সবজিরও চাহিদা রয়েছে।
শ্রীবরদীর কাকিলাকুড়া এলাকার কৃষকরা করলা, বরবটি, ঝিঙে, চায়না ট্যারাস, কচু ও অন্যান্য সবজি চাষ করে ভালো লাভের আশা করছেন। নালিতাবাড়ীর বগাডুবি এলাকার কৃষকরাও নিচু জমিতে কচু আবাদ করে লাভবান হচ্ছেন। তাদের কেউ কেউ প্রতি কচু ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।
ঝিনাইগাতীর গোমরা এলাকার কৃষক আনোয়ার হোসেন জানান, এলাকার দুই শতাধিক কৃষক সবজি চাষ করছেন। সবজির ব্যাপক চাহিদা থাকায় উৎপাদিত ফসল বাজারে বিক্রি করে তারা ভালো দাম পাচ্ছেন। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা মাঠ থেকেই সবজি কিনে ট্রাক ভর্তি করে নিয়ে যাচ্ছেন।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড়ি মাটি সবজি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। জেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে প্রচুর সবজি উৎপাদন হওয়ায় স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে কৃষকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি এসেছে।
ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ফরহাদ হোসেন বলেন, পাহাড়ি মাটি সবজি চাষের জন্য উপযোগী। কয়েকটি গ্রামকে সবজিগ্রাম হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এসব এলাকায় প্রচুর সবজি উৎপাদন হচ্ছে।
নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল-আমিন বলেন, মধ্যস্বত্বভোগী না থাকলে কৃষকরা সরাসরি বাজারজাত করে আরও লাভবান হতে পারবেন। এ বিষয়ে কৃষকদের সহযোগিতা করা হচ্ছে।
জেলা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে জেলার চার উপজেলায় প্রায় ৩ হাজার ৬৯৪ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছে। উৎপাদিত সবজির বাজারমূল্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকা হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মিজ ফরিদা ইয়াসমিনও কৃষকদের মাঠ থেকে সরাসরি বাজারে সবজি বিক্রির সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে কৃষক ন্যায্য দাম পাওয়ার পাশাপাশি ভোক্তারাও তুলনামূলক কম দামে সবজি কিনতে পারবেন।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, অতিরিক্ত কীটনাশক ও সারের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই নিরাপদ ও বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের দিকে আরও নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সবজি উৎপাদন ও বিপণনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে শেরপুরের কৃষি অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন