একসময় প্রিয়জনের খবর কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো বার্তা পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম ছিল চিঠি। ডাকপিয়নের অপেক্ষায় থাকতেন মানুষ। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারে চিঠির ব্যবহার কমলেও থেমে নেই ডাক বিভাগ। বরং ঐতিহ্যবাহী ডাকসেবার গণ্ডি পেরিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ডাক ও লজিস্টিকস সেবায় রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আগামী ৯ অক্টোবর পালিত হবে বিশ্ব ডাক দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘One Postal Network, Infinite Possibilities’। এর বাংলা করা হয়েছে—‘সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক সীমাহীন সম্ভাবনা’।
১৮৭৪ সালের ৯ অক্টোবর Universal Postal Union (UPU) প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক দিনকে স্মরণ করে ১৯৬৯ সালে টোকিওতে অনুষ্ঠিত UPU Congress-এ ৯ অক্টোবরকে বিশ্ব ডাক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ডাক ব্যবস্থার অবদান সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
চিঠির বাইরে নতুন পরিচয়ে ডাক বিভাগ
বিশ্ব ডাক দিবস ২০২৬ এমন সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ ডাক বিভাগ তার ঐতিহ্যবাহী সেবার পাশাপাশি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ ও জনবান্ধব ডাক ও লজিস্টিকস সেবা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
সরকারের গৃহীত কর্মপরিকল্পনা ও নীতিগত নির্দেশনার আলোকে ডাক বিভাগের সেবার আধুনিকায়ন, ডিজিটাল রূপান্তর, ই-কমার্স ও লজিস্টিকস সক্ষমতা বৃদ্ধি, উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্তকরণ এবং জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে উদ্যোক্তাভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস, পোস্ট পিকআপ ও ডেলিভারি সেবা, ই-কমার্স ও লজিস্টিকস সহায়তায় ফুলফিলমেন্ট সেন্টার চালু, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ট্রেসিং, কৃষিপণ্য ও মৌসুমি ফল পরিবহন এবং দ্রুত ও সাশ্রয়ী পার্সেল সেবা ‘স্পিড পোস্ট’।
স্পিড পোস্টে ৮১১ টন পণ্য
ডাক বিভাগের পরিবর্তনের অন্যতম বড় উদাহরণ স্পিড পোস্ট। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে এ পর্যন্ত এ সেবার মাধ্যমে প্রায় ৮১১ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে।
বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহনের এ চিত্র বলছে, দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী পার্সেল সেবা হিসেবে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের প্রতি জনগণ ও উদ্যোক্তাদের আস্থা বাড়ছে।
বিশেষ করে ই-কমার্স, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, কৃষক এবং অনলাইন ব্যবসায়ীদের জন্য দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে স্পিড পোস্ট গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছে।
বিদেশগামী পার্সেল বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ
দেশের অভ্যন্তরীণ সেবার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পার্সেল পরিবহনেও অগ্রগতি হয়েছে ডাক বিভাগের।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশগামী পার্সেলের পরিমাণ ছিল ২৪৩ টন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৬ টনে।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে একই সময়ে বিদেশগামী পার্সেল পরিবহন বেড়েছে ৭৩ টন, যা প্রায় ২৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
এই প্রবৃদ্ধি প্রবাসী বাংলাদেশি, সাধারণ নাগরিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে পণ্য পাঠানো উদ্যোক্তাদের কাছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের আন্তর্জাতিক পার্সেল সেবার ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কর্মসংস্থানেও নতুন সুযোগ
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডাক বিভাগের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস চালু করা।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে ডাকসেবা আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে সৃষ্টি হচ্ছে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা। একই সঙ্গে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি, ই-কমার্স, কৃষিপণ্য বিপণন ও নাগরিক সেবাকে একটি বিস্তৃত সরকারি লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার পথও তৈরি হচ্ছে।
পোস্টাল ব্যালটে ১৫ লাখের বেশি ভোট
নাগরিক সেবায় ডাক বিভাগের ভূমিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসী ও দেশের অভ্যন্তরে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জনের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা হয়।
এতে নাগরিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ডাক নেটওয়ার্কের সক্ষমতা ও বিস্তৃত ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
৯ অক্টোবর থেকে ডাকসেবা সপ্তাহ
বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষে আগামী ৯ ও ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সব পর্যায়ের কার্যালয়ে (সঞ্চয় ব্যাংক কার্যক্রম ছাড়া) ডাকসেবা দেওয়া হবে।
এ ছাড়া ৯ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশব্যাপী পালিত হবে ‘ডাকসেবা সপ্তাহ’। এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি উৎসব, ফিলাটেলিক প্রদর্শনী ও ডাকসেবা বিষয়ক মেলার আয়োজন করা হবে।
সামনে সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক
বাংলাদেশ ডাক বিভাগের পরিবর্তনের মূল শক্তি দেশের বিস্তৃত ডাক নেটওয়ার্ক ও জনগণের দীর্ঘদিনের আস্থা। সেই নেটওয়ার্ককে আধুনিক প্রযুক্তি, নতুন অবকাঠামো, উদ্যোক্তা অংশগ্রহণ এবং উন্নত গ্রাহকসেবার সঙ্গে যুক্ত করে ভবিষ্যতের সমন্বিত ডাক ও লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পথে এগোচ্ছে ডাক বিভাগ।
‘One Postal Network, Infinite Possibilities’—‘সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক সীমাহীন সম্ভাবনা’—এই প্রত্যয় সামনে রেখে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ এখন শুধু চিঠি বা পার্সেল পৌঁছে দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়; বরং দ্রুত, সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও বহুমুখী জনসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার একটি আধুনিক নেটওয়ার্ক হিসেবে নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তুলতে চাইছে।
মন্তব্য করুন