Advertisement
বৃহস্পতিবার, 01 অক্টোবর 2026
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ
আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারে মনোনীত শেরপুরের শায়রি শেরপুরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় শেরপুরে হারিয়ে যাচ্ছে ঢেঁকি, স্মৃতিতে নবান্নের সেই দিন শিশুদের ‘নোবেল’ পুরস্কারে মনোনীত শেরপুরের শিশু সাংবাদিক জয়া শেরপুরে ৮১তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের সমাপনী: নিষ্ঠা-সততায় জনসেবার আহ্বান জেলা প্রশাসকের নকলায় কৃষক কার্ড ও কৃষি প্রণোদনা বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন প্রকল্পের অপচয় ঠেকাতে এআই ব্যবহারের তাগিদ শিল্পমন্ত্রীর শেরপুরে ৪০০ কলাগাছ কেটে ফেলার অভিযোগ, বিচারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন হজযাত্রীদের কর-চার্জ কমানো ও ফ্লাইট স্লট অনুমোদনে সৌদির সহযোগিতা চাইলেন বিমানমন্ত্রী প্রত্যেক ঘরে কর্মসংস্থান সৃষ্টিই সরকারের লক্ষ্য: যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী

মিয়ানমারে মুসলমানদের জীবন-সংগ্রাম

মিয়ানমারে মুসলমানদের জীবন-সংগ্রাম
News Banner

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধপ্রধান দেশ মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরেই মুসলমানদের বসবাস। দেশটির ইতিহাস, বাণিজ্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতির নানা পর্যায়ে মুসলিম জনগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতির কথা পাওয়া যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নানা রাজনৈতিক পরিবর্তন, সাম্প্রদায়িক সংঘাত, বৈষম্য ও নিপীড়নের কারণে দেশটির মুসলমানদের জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন, বাস্তুচ্যুতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। ফলে মিয়ানমারের মুসলমানদের জীবন-সংগ্রাম এখন শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংকটের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

মিয়ানমারে ইসলামের আগমন:

মিয়ানমারে ইসলামের ইতিহাস বহু শত বছরের পুরোনো। ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনায় জানা যায়, আরব ও পারস্যের মুসলিম বণিকরা সমুদ্রপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতের সময় মিয়ানমারের উপকূলীয় এলাকাতেও প্রবেশ করেন।

সপ্তম শতক থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক শতকে আরব ও পারস্যের বণিকদের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ বাড়তে থাকে। বাণিজ্যের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে। এর মধ্য দিয়ে দেশটির বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল ও নগরে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি বিস্তৃত হয়।

পরবর্তী সময়ে ভারতীয় মুসলমানদেরও মিয়ানমারে যাতায়াত বাড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন ও বিভিন্ন পেশায় মুসলমানদের অংশগ্রহণের ফলে দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে তাদের অবস্থান তৈরি হয়।

আরাকানে মুসলিমদের প্রভাব:

মিয়ানমারের ইতিহাসে আরাকান বা বর্তমান রাখাইন অঞ্চল মুসলিমদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পঞ্চদশ শতকে আরাকানের রাজা নরমিখলা ক্ষমতা হারিয়ে বাংলায় আশ্রয় নেন। পরে বাংলার শাসকের সহযোগিতায় তিনি আরাকানের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

এই সময় মুসলিম সৈন্য ও কর্মকর্তাদের একটি অংশ আরাকানে থেকে যান। মুসলমানদের প্রতি রাজপরিবারের আনুকূল্যের কারণে প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও মুসলমানদের নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী, সেনাপতি, মন্ত্রী ও বিচারকের মতো দায়িত্বেও মুসলিম ব্যক্তিদের থাকার কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়।

আরাকানে মুসলিম স্থাপত্য, মসজিদ, মাদরাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পেছনেও এই সময়ের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সংকটের শুরু ও বৈষম্য:

সময়ের সঙ্গে মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। মুসলমানদের ওপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ এবং ধর্মীয় অনুশাসন পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগও ইতিহাসে রয়েছে।

রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কখনো সামাজিক, কখনো ধর্মীয় এবং কখনো রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। বিভিন্ন সময় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও দাঙ্গায় মুসলমানদের ঘরবাড়ি, মসজিদ, মাদরাসা ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলেও মিয়ানমারের মুসলমানদের নিয়ে সামাজিক উত্তেজনা তৈরি হয়। ভারতীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া ক্ষোভের প্রভাব মুসলমানদের ওপরও পড়ে। ১৯৩০ ও ১৯৩৮ সালে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় মুসলমানদের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।

সামরিক শাসন ও নতুন সংকট:

১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইনের ক্ষমতা গ্রহণের পর মিয়ানমারে দীর্ঘ সামরিক শাসনের সূচনা হয়। এ সময় মুসলমানসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মুখোমুখি হয়।।

নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নাগরিকত্বের প্রশ্নে মুসলমানদের বড় একটি অংশ ক্রমেই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের প্রশ্নটি সময়ের সঙ্গে আরও জটিল হয়ে ওঠে।

২০১২ সালের দাঙ্গা:

২০১২ সালে রাখাইন রাজ্যে বৌদ্ধ ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
এরপর ২০১৩ সালেও মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকায় মুসলিমবিরোধী সহিংসতার ঘটনা ঘটে। একের পর এক সংঘাতের কারণে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়তে থাকে।

রোহিঙ্গা সংকট:

মিয়ানমারের মুসলমানদের জীবন-সংগ্রামের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় রোহিঙ্গা সংকট। ২০১৬ সালের শেষ দিকে এবং বিশেষ করে ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানকে কেন্দ্র করে ব্যাপক মানবিক সংকট তৈরি হয়।।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এসব ঘটনায় হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির অভিযোগ নথিবদ্ধ করেছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

মিয়ানমার সরকার নিরাপত্তা অভিযানকে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বেসামরিক জনগণের ওপর সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।

আজও অনিশ্চয়তার জীবন:

মিয়ানমারের মুসলমানদের সংকট শুধু রোহিঙ্গাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত মুসলিম জনগোষ্ঠীও ধর্মীয় স্বাধীনতা, সামাজিক নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তবে সব মুসলমানের অভিজ্ঞতা এক নয়। জাতিগোষ্ঠী, অঞ্চল, নাগরিকত্বের অবস্থান ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর তাদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে।
একসময় বাণিজ্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে মিয়ানমারের সমাজে নিজেদের অবস্থান তৈরি করা মুসলমানদের ইতিহাস তাই একই সঙ্গে সমৃদ্ধ ও বেদনাবিধুর। শত শত বছরের সেই ইতিহাসের পাশে আজও রয়েছে নিরাপত্তাহীনতা, বাস্তুচ্যুতি, নাগরিকত্বের সংকট এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন।

মিয়ানমারের মুসলমানদের জীবন-সংগ্রামের ইতিহাস মূলত একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ—মিয়ানমারের বাস্তবতাই তার বড় উদাহরণ।

এই সংবাদটি পঠিত হয়েছে: 50 বার

নিউজ ডেস্ক

স্টাফ রিপোর্টার

এই সাংবাদিকের মোট খবর: 256 টি

মন্তব্য করুন