শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রচারাভিযান, পথশিশুদের অধিকার রক্ষায় উদ্যোগ এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার-২০২৬-এর জন্য মনোনীত হয়েছেন শেরপুরের কিশোরী ফারাবি জাবিন শায়রি।
শিশুদের ‘নোবেল’ হিসেবে পরিচিত এ পুরস্কারের জন্য বিশ্বের ৫৭টি দেশের ২৮০ জন শিশুর সঙ্গে মনোনয়ন পেয়েছেন ১৬ বছর বয়সী শায়রি। গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মনোনীতদের তালিকায় তাঁর নাম উঠে আসে।
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামভিত্তিক শিশু অধিকারবিষয়ক সংস্থা কিডস রাইটস ফাউন্ডেশন প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা শিশুদের এ পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে।
শেরপুরের মেয়ে শায়রি ছোটবেলা থেকেই নিজ এলাকায় বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও শিক্ষাবঞ্চনার চিত্র দেখে আসছেন। গ্রামাঞ্চলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার বয়সেই অনেক মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়া এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের শিশুদের মধ্যে কুসংস্কার, শিক্ষার সুযোগের অভাব ও দারিদ্র্যের প্রভাব তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। এসব সমস্যা থেকে শিশুদের মুক্ত করতে নিজেই উদ্যোগী হন তিনি। পরিবারের পক্ষ থেকে নিরুৎসাহিত করা হলেও শিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ চালিয়ে যান শায়রি।
প্রথমে শেরপুরের বিভিন্ন এলাকায় বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান শুরু করেন তিনি। পরে তাঁর কার্যক্রম বিস্তৃত হয় রাজধানী ঢাকায়। সেখানে পথশিশুদের সঙ্গে সরাসরি কাজ শুরু করেন। শিশুদের অধিকার রক্ষায় গড়ে তোলেন একটি উদ্যোগ, যার মূল দর্শন—বিদ্যালয় হবে শিশুদের জন্য ‘দ্বিতীয় বাড়ি’।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে শায়রি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘সেফ চাইল্ড ক্লাব’ (Safe Child Clubs)। এসব ক্লাবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাল্যবিবাহ, নির্যাতন ও শিশুশ্রমের মতো সমস্যার কথা নিরাপদে জানাতে পারে। পাশাপাশি, শিশুদের অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শিশুদের অধিকার নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে ভিডিওকেও প্রচারের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন শায়রি। সাম্প্রতিক এক নির্বাচনের সময় পথশিশুদের নিয়ে তৈরি করেন কয়েকটি ভিডিও। এসব ভিডিওতে জাতীয় পর্যায়ে নানা অগ্রগতির মধ্যেও পথশিশুদের জীবনযাত্রায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসার চিত্র তুলে ধরেন তিনি। তাঁর প্রচারণামূলক ভিডিওগুলো ইতিমধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছেছে।
বিভিন্ন প্রচারাভিযান, শিশুদের নিয়ে ক্লাব গঠন এবং সৃজনশীল উদ্যোগের মাধ্যমে শায়রি ক্রমেই অবহেলিত শিশুদের অধিকার ও সমস্যাগুলো তুলে ধরছেন। তাঁর এসব কার্যক্রমের স্বীকৃতি হিসেবেই এসেছে আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের মনোনয়ন।
মনোনয়ন পাওয়ার অনুভূতি জানিয়ে শায়রি বলেন, ‘এই মনোনয়ন আমার জন্য শুধু একটি স্বীকৃতি নয়, বরং শিশুদের অধিকার নিয়ে আরও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার অনুপ্রেরণা। ছোটবেলা থেকেই আমি বিশ্বাস করি, পরিবর্তনের জন্য বড় হওয়ার অপেক্ষা করতে হয় না। শিশুরাও শিশুদের জন্য আওয়াজ তুলতে পারে।
এই স্বীকৃতি আমাকে আরও বেশি শিশু ও তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করার সাহস দেবে। পুরস্কার পাই বা না পাই, শিশুদের জন্য আমার কাজ চলমান থাকবে।’
মন্তব্য করুন