Advertisement
রবিবার, 04 অক্টোবর 2026
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ

‘গরিবের হাসপাতাল’, অর্থের অভাবে কারও চিকিৎসা বন্ধ হয় না

‘গরিবের হাসপাতাল’, অর্থের অভাবে কারও চিকিৎসা বন্ধ হয় না
News Banner

অর্থের অভাবে যেন কারও চিকিৎসা বন্ধ না হয়—এমন লক্ষ্য নিয়ে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মুন্সীরহাটে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এক চিকিৎসাকেন্দ্র। ২০ বন্ধুর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত মুন্সীরহাট ক্লিনিকটি স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছে ‘গরিবের হাসপাতাল’ নামে। এখানে অসচ্ছল রোগীরা পাচ্ছেন বিনা মূল্যে চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ।

উদ্যোক্তাদের কেউ চিকিৎসক, কেউ শিক্ষক, কেউ ব্যাংকার, আবার কেউ ব্যবসায়ী। নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েও তাঁরা এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এক হয়েছেন। তাঁদের লক্ষ্য, অর্থের অভাবে যেন কোনো মানুষ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন।

মুন্সীরহাট বাজার আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে চিকিৎসার ব্যয় ছিল বড় দুশ্চিন্তার কারণ। সেই বাস্তবতা বদলাতে ২০ বন্ধুর সম্মিলিত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় মুন্সীরহাট ক্লিনিক।

স্থানীয় ও ক্লিনিক সূত্রে জানা যায়, ২০ জন উদ্যোক্তার মধ্যে ছয়জন চিকিৎসক। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আরও প্রায় ১৫ জন চিকিৎসক। তাঁদের অধিকাংশই স্থানীয় বাসিন্দা। বাসন্ডা, যুগীরহাট, মেশতলা, চাঁনপুর, বিষয়ভাগ, ফুলমুড়ি, কাদঘর, কনকপুর, শুভপুর, আনন্দপুর ও খিরনশালসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার চিকিৎসকেরাও এখানে রোগী দেখেন।

ক্লিনিকটির অন্যতম বিশেষত্ব হলো, রোগীর আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় চিকিৎসাসেবা দেওয়া। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা ওষুধের বাড়তি খরচ চাপিয়ে না দিয়ে সাধ্যের মধ্যে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করাই তাঁদের লক্ষ্য। যাঁদের চিকিৎসার ব্যয় বহনের সামর্থ্য নেই, তাঁদের বিনা মূল্যে সেবা দেওয়া হয়। এমনকি জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের অন্য হাসপাতালে চিকিৎসার জন্যও সহায়তা করা হয়।

সরেজমিনে মুন্সীরহাট ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ভিড়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন নিম্নবিত্ত, অসহায় ও প্রবীণ মানুষ। অনেকের কাছেই চিকিৎসকের পরামর্শ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের খরচ জোগানো কঠিন। তবে এই ক্লিনিকে এসে অনেকেই পাচ্ছেন স্বস্তি।

এমনই একজন কামাল হোসেন। একসময় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। বয়সের ভারে এখন অবসর জীবন কাটছে তাঁর। সন্তানদের পরিবারের সহায়তায় খাবারের ব্যবস্থা হলেও চিকিৎসার খরচ বহন করা তাঁর জন্য কঠিন। মুন্সীরহাট ক্লিনিকে এসে চিকিৎসকের পরামর্শের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিনা মূল্যে ওষুধ পেয়েছেন তিনি।

ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, এখানে আসা মোট রোগীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কোনো না কোনোভাবে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসুবিধা পান। এ ছাড়া রোগীর আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় অনেকের বিল অর্ধেক বা পুরোপুরি মওকুফ করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা সাতবাড়িয়ার সফিকুর রহমান, ফুলমুড়ির হাসান হাজারী, যুগীরহাটের কাজী নজরুল ইসলাম নজির, কনকপুরের দীন মোহাম্মদ ও একই গ্রামের আকমিলমা বেগম বলেন, মুন্সীরহাট ক্লিনিকে অর্থের অভাবে কারও চিকিৎসা বন্ধ থাকে না। চিকিৎসকেরা এলাকার মানুষ হওয়ায় রোগীদের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় ও আন্তরিকতা রয়েছে। রোগীর আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার চাপও নেই।

মুন্সীরহাট হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক ইয়াছমিন আক্তার বলেন, ক্লিনিকটির উদ্যোক্তাদের অধিকাংশই তাঁর সাবেক শিক্ষার্থী। তাঁরা চাইলে শহরে থেকে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু এলাকার মানুষের কথা চিন্তা করে গ্রামে থেকেই চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হয়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।

তিনি আরও বলেন, সচ্ছল রোগীদের কাছ থেকেও যে বিল নেওয়া হয়, তা সাধারণত বাজারের তুলনায় কম। আর কারও আর্থিক সংকট থাকলে তাঁর বিল অর্ধেক কিংবা পুরোপুরি মওকুফ করা হয়।

মুন্সীরহাট ক্লিনিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. আবু জাফর বলেন, উদ্যোক্তা ও চিকিৎসকেরা সবাই এ এলাকার মানুষ। তাঁরা নিজেদের অবস্থান থেকে এলাকার মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করেছেন। কারণ, গ্রামের অনেক মানুষের ব্যয়বহুল চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই। সে কথা বিবেচনা করেই কম খরচে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, যাঁদের চিকিৎসার খরচ বহনের সামর্থ্য নেই, তাঁদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কোনো রোগীর জটিল সমস্যা দেখা দিলে রোগী কল্যাণ তহবিল থেকে সহায়তা করে অন্যত্র চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়।

ডা. আবু জাফরের ভাষ্য, ‘ব্যবসা নয়, সেবাটাই আমাদের কাছে মুখ্য। রোগীদের জন্য এত ছাড় দেওয়ার পরও আলহামদুলিল্লাহ, হাসপাতালটি ভালোভাবেই চলছে।’

২০ বন্ধুর এই উদ্যোগে মুন্সীরহাট ক্লিনিক এখন শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়, বরং এলাকার অসচ্ছল মানুষের ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রমাণিত হচ্ছে, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সদিচ্ছা থাকলে নিজ এলাকার মানুষের জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

এই সংবাদটি পঠিত হয়েছে: 42 বার

নিউজ ডেস্ক

স্টাফ রিপোর্টার

এই সাংবাদিকের মোট খবর: 305 টি

মন্তব্য করুন