বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি সম্প্রসারণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে দেশীয় উৎপাদকদের আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার বিষয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্টস বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিবিএ) নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, এমপি শামা ওবায়েদ ইসলাম। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে বিজিবিএ নেতৃবৃন্দ আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বাংলাদেশি উৎপাদকদের মধ্যে বাণিজ্যিক সেতু হিসেবে বায়িং হাউস ও লিয়াজোঁ অফিসগুলোর ভূমিকা এবং সংগঠনের বর্তমান কার্যক্রম তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি মিশনগুলো কীভাবে নতুন ক্রেতা ও বাজার অনুসন্ধানে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়।
আলোচনায় নতুন বাজারে প্রবেশের পাশাপাশি বিদ্যমান বাজারগুলো আরও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিজিবিএ নেতৃবৃন্দ বলেন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি শুধু বিদ্যমান পণ্যের পরিমাণ বাড়ানোর ওপর নির্ভরশীল নয়। নতুন পণ্য, নতুন বাণিজ্যিক চ্যানেল এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশি উৎপাদকদের যুক্ত করা গেলে রপ্তানির পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদকরাও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাবেন।
বৈঠকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে ‘ইনকিউবেটর কমিউনিটি’ গঠন এবং উদ্ভাবনী সোর্সিং চ্যানেল চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়। এর মাধ্যমে উৎপাদকদের গুণমান, ডকুমেন্টেশন, কমপ্লায়েন্স ও পণ্য সরবরাহের আন্তর্জাতিক মান পূরণে প্রস্তুত করে বায়িং হাউস ও বাংলাদেশি মিশনের মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
এ সময় বিজিবিএ ব্যবসায়ী সদস্যদের ক্রেতা সভা, বাণিজ্য মেলা ও বাজার উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য ব্যবসায়িক ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, বিদেশি ক্রেতাদের বাংলাদেশ সফর, সোর্সিং ট্রিপ ও কারখানা পরিদর্শনের জন্য ভিসা সুবিধা এবং বাংলাদেশি মিশনের বাণিজ্যিক কর্মকর্তাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানায়।
এ ছাড়া ক্রেতা শনাক্তকরণ, ব্যবসায়িক পরিচিতি তৈরি, বিক্রয়োত্তর সেবা এবং বাণিজ্যিক জটিলতা নিরসনে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি মিশনগুলোর সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিজিবিএ নেতৃবৃন্দ আঞ্চলিক উৎস সম্প্রসারণ এবং অশুল্ক ও আধা-শুল্ক বাধা কমাতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানান। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী করতে প্রবাসী চেম্বার এবং ব্যবসায়ী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বিষয়ে সহযোগিতা চান তারা।
বিদ্যমান বাজারের পাশাপাশি বলকান দেশগুলো, পোল্যান্ড ও রোমানিয়ার বাজারে বাংলাদেশের ব্যবসা সম্প্রসারণের বিষয়ে বিশেষ আগ্রহের কথা জানান সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অর্থপ্রদান ও সরবরাহসংক্রান্ত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধানের বিষয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠকে বিজিবিএ-এর বাস্তবভিত্তিক প্রস্তাবের প্রশংসা করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি সংগঠনটিকে লক্ষ্যভিত্তিক দেশগুলোর একটি সুস্পষ্ট তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দেন। এতে প্রতিটি দেশের বাজার, পণ্যের ধরন, সম্ভাব্য ক্রেতাদের প্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি মিশনের কাছে প্রত্যাশিত সহযোগিতার বিষয় উল্লেখ করতে বলা হয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয়, বিজিবিএ এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি বাণিজ্যিক শাখাগুলোর মধ্যে কার্যকর ও নিয়মিত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা কোন মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, কী ধরনের সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব এবং কত সময়ের মধ্যে সাড়া পাওয়া যেতে পারে—এসব বিষয়ে একটি পূর্বানুমেয় কাঠামো পাবেন।
তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও বিনিয়োগকে সহজতর করার উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের পোশাক বাণিজ্যে বায়িং হাউসগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে শুধু বড় প্রতিষ্ঠানের অর্ডার ধরে রাখার পাশাপাশি ক্ষুদ্র উৎপাদকদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি, সীমিত বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং লক্ষ্যভিত্তিক বাজারে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে হবে।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি শাখা বিজিবিএ-এর সঙ্গে একটি বিশেষ যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করবে। সংগঠনটির কাছ থেকে লক্ষ্যভিত্তিক দেশগুলোর বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত নোট পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি মিশনগুলোকে প্রয়োজনীয় দায়িত্ব দেওয়া হবে।
এ ছাড়া ব্যবসায়ী সদস্য ও প্রকৃত বাণিজ্যিক ক্রেতাদের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। ‘ইনকিউবেটর কমিউনিটি’ গঠনের ধারণাটিকেও প্রাথমিকভাবে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে একটি নির্দিষ্ট পাইলট প্রকল্প হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে বলা হয়, অর্থনৈতিক কূটনীতির উদ্দেশ্য রপ্তানিকারক ও বাণিজ্যিক মধ্যস্থতাকারীদের কাজের বিকল্প হওয়া নয়; বরং তাদের কাজকে আরও কার্যকর করা। বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ, সময়মতো ভিসা, বাণিজ্যিক কর্মকর্তাদের সহযোগিতা এবং সরকারি পর্যায়ে সমাধানযোগ্য বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূর করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কূটনীতি বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিজিবিএ-এর সঙ্গে আজকের বৈঠকের মাধ্যমে সেই সহযোগিতা কাঠামোকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হলো।
মন্তব্য করুন