মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার ঘাগড়া লস্কর খানবাড়ি জামে মসজিদ। প্রায় ২১৮ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন এই মসজিদ। এর নান্দনিক স্থাপত্য, গম্বুজ, খিলান ও দেয়ালের কারুকাজ আজও মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের। তবে যথাযথ পরিচর্যা ও সংস্কারের অভাবে ঐতিহাসিক স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে।
শেরপুর জেলা সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে ঘাগড়া লস্কর গ্রামে অবস্থিত মসজিদটি স্থানীয়ভাবে খানবাড়ি মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদের প্রবেশদ্বারে কষ্টিপাথরে খোদাই করা শিলালিপিতে হিজরি ১২২৮ সাল ও ১৮০৮ খ্রিষ্টাব্দের উল্লেখ রয়েছে। সেই হিসাবে মসজিদটির বয়স প্রায় ২১৮ বছর।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য ও প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর আত্মগোপনে থাকা আজিমোল্লাহ খান নামের এক ব্যক্তি মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয়দের কাছে প্রচলিত রয়েছে, আত্মগোপনে থাকার কারণে তাঁর নামের সঙ্গে ‘পলায়ন খান’ পরিচিতিও যুক্ত হয়েছিল। মসজিদটির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে অবশ্য ভিন্ন বর্ণনাও রয়েছে।
স্থাপত্যশৈলীতে মসজিদটি বেশ স্বতন্ত্র। বাইরে থেকে বিশাল মনে হলেও ভেতরের আয়তন তুলনামূলক ছোট। দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রায় ৩০ ফুট করে নির্মিত মূল ভবনে রয়েছে সুদৃশ্য গম্বুজ, খিলান ও নকশাখচিত মেহরাব। দেয়ালে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ফুল ও ফুলদানির কারুকাজ। চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত প্রায় চার ফুট পুরু দেয়াল প্রাচীন নির্মাণকৌশলের পরিচয় বহন করছে।
মসজিদের মূল ভবনের জন্য রয়েছে ৫৮ শতক জমি। এ ছাড়া বারান্দার আয়তন ১৭ শতক এবং কবরস্থানের জন্য রয়েছে ৪১ শতক জমি। মূল মসজিদের ভেতরে একসঙ্গে প্রায় ৩০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বারান্দায় নামাজ পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে আরও প্রায় ৫০ জনের। বর্তমানে মসজিদটির ইমাম হাফেজ মো. রুহুল আমীন জুমাসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ান।
দীর্ঘদিন ধরে মসজিদটি এলাকার মানুষের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা প্রাচীন স্থাপনাটি দেখতে আসেন। এর স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণকৌশল অতীতের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদটির বিভিন্ন অংশ নাজুক হয়ে পড়ায় সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে কিছু সংস্কারকাজ করা হলেও নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে মসজিদটির বিভিন্ন অংশ ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। দুই যুগ আগে মসজিদ পরিচালনায় ২১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে কমিটির সভাপতির মৃত্যুর পর নতুন করে কমিটি গঠন করা হয়নি। একসময় মসজিদটির দেখভালের জন্য সরকারি খাদেম নিয়োগ দেওয়া হলেও বর্তমানে সেই পদ শূন্য রয়েছে।
মসজিদের ইমাম হাফেজ মো. রুহুল আমীন বলেন, মুসল্লির সংখ্যা বাড়লেও মসজিদের ভেতরে জায়গার সংকুলান হয় না। বিশেষ করে জুমার নামাজে মুসল্লিদের ভিড় সামলাতে সমস্যা হয়। ঐতিহাসিক এই মসজিদটির প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংরক্ষণ জরুরি।
স্থানীয়রা বলছেন, খানবাড়ি মসজিদ শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়, এটি এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই মসজিদটির ঐতিহাসিক স্থাপত্য অক্ষুণ্ন রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। তাঁরা দ্রুত সংস্কার, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং সরকারি খাদেম নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৮ সালের পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইনের আওতায় মসজিদটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে স্থাপনাটি পরিদর্শনও করেছেন। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পরিদর্শনের পাশাপাশি নিয়মিত পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল আমীন বলেন, প্রাচীন এই মসজিদটির দেখভাল ও সংস্কারের দায়িত্ব জাতীয় জাদুঘর ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের। সংশ্লিষ্ট বিভাগের শেরপুর বা জামালপুরে কোনো কার্যালয় রয়েছে কি না, তা খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। মসজিদটির ভঙ্গুর অবস্থা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জোর তাগিদ দেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন