Advertisement
বৃহস্পতিবার, 01 অক্টোবর 2026
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ
আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারে মনোনীত শেরপুরের শায়রি শেরপুরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় শেরপুরে হারিয়ে যাচ্ছে ঢেঁকি, স্মৃতিতে নবান্নের সেই দিন শিশুদের ‘নোবেল’ পুরস্কারে মনোনীত শেরপুরের শিশু সাংবাদিক জয়া শেরপুরে ৮১তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের সমাপনী: নিষ্ঠা-সততায় জনসেবার আহ্বান জেলা প্রশাসকের নকলায় কৃষক কার্ড ও কৃষি প্রণোদনা বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন প্রকল্পের অপচয় ঠেকাতে এআই ব্যবহারের তাগিদ শিল্পমন্ত্রীর শেরপুরে ৪০০ কলাগাছ কেটে ফেলার অভিযোগ, বিচারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন হজযাত্রীদের কর-চার্জ কমানো ও ফ্লাইট স্লট অনুমোদনে সৌদির সহযোগিতা চাইলেন বিমানমন্ত্রী প্রত্যেক ঘরে কর্মসংস্থান সৃষ্টিই সরকারের লক্ষ্য: যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী

হারিয়ে যাচ্ছে কুয়া, গ্রামবাংলায় এখন শুধুই স্মৃতি

হারিয়ে যাচ্ছে কুয়া, গ্রামবাংলায় এখন শুধুই স্মৃতি
News Banner

একসময় গ্রামবাংলার সকাল শুরু হতো কুয়ার পাড়ে। সূর্যের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই শোনা যেত দড়ি টানার শব্দ, কাঠের চাকার ঘর্ষণ আর কলসির ঠোকাঠুকি। কাঁধে কলসি কিংবা হাতে বালতি নিয়ে কুয়ার কাছে জড়ো হতেন গ্রামের নারী-পুরুষ। পানি তোলার ফাঁকে চলত গল্প, হাসি-আড্ডা আর সুখ-দুঃখের ভাগাভাগি। গভীর মাটি থেকে উঠে আসা এক বালতি ঠান্ডা পানির সঙ্গে যেন উঠে আসত গ্রামীণ জীবনের অসংখ্য গল্পও।

সময় বদলেছে। বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপন। নলকূপ, পাইপলাইনের পানি ও সাবমার্সিবল পাম্প সহজ করে দিয়েছে পানির ব্যবহার। ফলে একসময় গ্রামের অপরিহার্য অংশ হয়ে থাকা কুয়া এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। কোথাও পরিত্যক্ত, কোথাও মাটি ও আবর্জনায় ভরাট। আবার কোথাও আগাছায় ঢেকে কেবল জানান দিচ্ছে তার পুরোনো অস্তিত্বের।

তবে কুয়া হারিয়ে গেলেও হারায়নি এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি। প্রবীণদের মনে এখনো জীবন্ত সেই কুয়ার পাড়, দড়ি-বালতি, কাঠের চাকা আর ভোরের কোলাহল।

কুয়ার পাড় ছিল সামাজিক মিলনস্থল:

কুয়া ছিল শুধু পানি সংগ্রহের জায়গা নয়; গ্রামীণ সমাজে এটি ছিল এক ধরনের সামাজিক মিলনস্থল। বিশেষ করে বাড়ির দৈনন্দিন কাজে পানির প্রয়োজন মেটাতে নারীদের নিয়মিত যেতে হতো কুয়ার কাছে।

কেউ পানি তুলতেন, কেউ কলসি ভরতেন, কেউ বাসনপত্র পরিষ্কার করতেন। কাজের ফাঁকে চলত সংসারের নানা কথা। কারও বিয়ের খবর, কারও নতুন অতিথি আসার গল্প, কারও পারিবারিক সুখ-দুঃখ—সবকিছুরই সাক্ষী হয়ে থাকত কুয়ার পাড়।

কখনো কাঁচের চুড়ির টুংটাং শব্দ, কখনো কলসির সঙ্গে হাতলের মৃদু ঠোকাঠুকি, আবার কখনো মেঠো হাসির শব্দে মুখর হয়ে উঠত চারপাশ। কুয়ার পানি যেমন মানুষের তৃষ্ণা মেটাত, তেমনি এর পাড় তৈরি করত মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের জায়গা।

কাঠের চাকার সেই চেনা শব্দ:

পুরোনো দিনের অনেক কুয়ায় পানি তোলার জন্য ব্যবহার করা হতো দড়ি ও বালতি। কোথাও কোথাও কাঠের চাকা বা কপিকল ব্যবহার করা হতো। দড়ি টানলে চাকা ঘুরত, আর গভীর কুয়া থেকে ধীরে ধীরে ওপরে উঠে আসত পানিভর্তি বালতি।

সকালের নীরবতায় সেই চাকার ঘর্ষণের শব্দ ছিল গ্রামের পরিচিত শব্দগুলোর একটি। আজকের প্রজন্মের কাছে যা হয়তো কেবল গল্প, একসময় সেটিই ছিল গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক দৃশ্য।

কুয়ার পানি সাধারণত মাটির নিচের স্তর থেকে সংগ্রহ করা হতো। তবে এর নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করত কুয়ার অবস্থান, নির্মাণ, চারপাশের পরিচ্ছন্নতা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর। যথাযথ সুরক্ষা ও পরিচর্যা না থাকলে কুয়ার পানি দূষিত হওয়ার ঝুঁকিও ছিল।

পথিকের তৃষ্ণা মেটাত কুয়া:

গ্রামের পথ ধরে চলা মানুষের কাছেও কুয়ার গুরুত্ব ছিল। গরমের দিনে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কেউ কুয়ার কাছে পৌঁছালে প্রথমেই চাইতেন একটু পানি। হাত-মুখ ধুয়ে কিংবা এক গ্লাস ঠান্ডা পানি পান করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেন পথিক।

চৈত্র-বৈশাখের তীব্র গরমে মাটির গভীর থেকে উঠে আসা তুলনামূলক শীতল পানি ছিল স্বস্তির। কুয়ার পাড়ের ছায়ায় বসে কয়েক মুহূর্ত বিশ্রাম নেওয়াও ছিল গ্রামের পথচারীদের পরিচিত অভ্যাস।

আজকের মতো তখন সর্বত্র বোতলজাত পানি কিংবা হাতের কাছে বৈদ্যুতিক পাম্পের ব্যবস্থা ছিল না। তাই কুয়া ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোরই একটি অংশ।

শিশু-কিশোরদের স্মৃতিতেও কুয়া:

কুয়াকে ঘিরে শিশু-কিশোরদের স্মৃতিও কম নয়। কেউ কুয়ার পানিতে নিজের মুখের প্রতিবিম্ব দেখার চেষ্টা করত। কেউ আবার কুয়ার ভেতর মুখ বাড়িয়ে শব্দ করে প্রতিধ্বনি শোনার আনন্দ পেত।

গরমের দিনে কোনো কোনো এলাকায় কুয়ার পানি গোসলের কাজেও ব্যবহার করা হতো। বালতি তুলতে গিয়ে কখনো সেটি হাতছাড়া হয়ে গভীরে পড়ে যেত। তখন সেটি উদ্ধারের জন্য শুরু হতো নানা চেষ্টা। ছোট্ট সেই ঘটনাও শিশুদের কাছে হয়ে উঠত দিনের বড় এক ঘটনা।

তখন হয়তো এসব ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই সাধারণ ঘটনাগুলোই আজ হয়ে উঠেছে অমূল্য স্মৃতি।

আধুনিকতায় বদলে গেছে পানির ব্যবহার:

গ্রামবাংলায় পানি ব্যবহারের চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। নলকূপের বিস্তার, বিদ্যুৎচালিত পাম্প, সাবমার্সিবল পাম্প এবং বিভিন্ন ধরনের পানি সরবরাহব্যবস্থার কারণে কুয়ার ওপর মানুষের নির্ভরতা কমেছে।
ফলে অনেক কুয়া আর ব্যবহার হয় না।

দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় কোথাও কুয়ার পাড় ভেঙে গেছে, কোথাও জমেছে শ্যাওলা ও আবর্জনা। কোথাও আগাছায় ঢেকে গেছে পুরো কাঠামো। কোনো কোনো কুয়া আবার মাটি দিয়ে ভরাট করে অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে এর সঙ্গে হারিয়ে গেছে গ্রামীণ জীবনের কিছু পরিচিত দৃশ্য ও সামাজিক যোগাযোগের জায়গাও।

কুয়া এখন স্মৃতির অংশ:

একসময় যে কুয়ার পাড়ে সকাল শুরু হতো, সেখানে এখন অনেক জায়গায় নেমে এসেছে নীরবতা। নেই কলসির সারি, নেই দড়ি টানার ব্যস্ততা, নেই কাঠের চাকার সেই ঘর্ষণের শব্দ। কালের বিবর্তনে কুয়া পরিণত হয়েছে স্মৃতির এক নিঃশব্দ প্রতীকে।

তবু প্রবীণদের স্মৃতিতে সেই দিনগুলো এখনো স্পষ্ট। কুয়ার ঠান্ডা পানি, ভোরের ব্যস্ততা, পাড়ের গল্প আর বিকেলের আড্ডা—সব মিলিয়ে কুয়া ছিল গ্রামীণ জীবনের এক অনন্য অংশ।

সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পরিবর্তনের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া কিছু দৃশ্য আর ফিরে আসে না। কুয়াও তেমনই এক হারিয়ে যেতে বসা স্মৃতি।

মাটির গভীরে থাকা সেই জল আজ হয়তো আর মানুষের তৃষ্ণা মেটায় না। কিন্তু স্মৃতির গভীরে থাকা কুয়ার পাড় এখনো অনেকের মন ভিজিয়ে দেয়। একসময় এক বালতি পানি তুলতে যে কুয়ার কাছে মানুষকে একত্র হতে হতো, সেই কুয়া আজ যেন দূর অতীতের দিকে তাকিয়ে থাকা এক নীরব সাক্ষী—গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া এক জীবনযাত্রার।

এই সংবাদটি পঠিত হয়েছে: 52 বার

নিউজ ডেস্ক

স্টাফ রিপোর্টার

এই সাংবাদিকের মোট খবর: 256 টি

মন্তব্য করুন