মাসে লাখ টাকা বেতনের চাকরি। করপোরেট প্রতিষ্ঠানে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা। তবু সেই নিশ্চিন্ত জীবন ছেড়ে মাইক্রোফোন হাতে তুলে নেন মোহাম্মদ আরিফুল হক সরকার। উপস্থাপনাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেন নতুন পথচলা। পরিবার ও সমাজের বিরোধিতা, পেশাগত অনিশ্চয়তা আর নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এখন তিনি কাজ করছেন মঞ্চ ও টেলিভিশনে। তাঁর স্বপ্ন, বাংলা ভাষায় উপস্থাপনার মাধ্যমে পৌঁছে যাবেন বিশ্বমঞ্চে।
জামালপুর সদর উপজেলার ৫ নম্বর ইটাইল ইউনিয়নের শৈলেরকান্দা ব্রহ্মত্তর গ্রামের প্রয়াত এমদাদুল হক সরকারের ছেলে আরিফুল। তাঁর মা হাসনা হেনা। দাদা মদিন সরকার। নানা আইনাল হকের বাড়ি শেরপুরের চাক-আন্দারিয়ায়। ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি ঝোঁক ছিল তাঁর। স্কুলের অনুষ্ঠান কিংবা পারিবারিক আয়োজনে উপস্থাপনা ও অভিনয়ের সুযোগ পেলেই অংশ নিতেন। সেই আগ্রহই একসময় হয়ে ওঠে জীবনের লক্ষ্য।
দীর্ঘ ১০ বছর করপোরেট চাকরি করেছেন আরিফুল। ভালো বেতন, নিশ্চিত আয়ের পথ—সবই ছিল। কিন্তু মনের ভেতর তাড়া করত মঞ্চের টান। একসময় চাকরির নিরাপদ জীবন ছেড়ে উপস্থাপনাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল বড় ঝুঁকি।
আরিফুল বলেন, “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা অবশ্যই কঠিন। এ দেশে এখনও অধিকাংশ মানুষ মনে করে, চাকরিই জীবনের একমাত্র সফলতা। আর আমি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এমন পাগলাটে ও অবাস্তব সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ভয়াবহ কঠিন ছিল।”
চাকরি ছেড়ে উপস্থাপনায় আসার পর শুরু হয় নতুন লড়াই। পরিবার, সমাজ, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের অনেকেই তাঁর সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ছিলেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পেশাটির অনিশ্চিত বাস্তবতা। আরিফুলের মতে, বাংলাদেশের মিডিয়া ও করপোরেট সংস্কৃতিতে উপস্থাপনা অনেকটাই নারী ও গ্ল্যামারকেন্দ্রিক। মধ্যবয়সে এসে দীর্ঘদিনের চাকরি ছেড়ে এ পেশায় আসা ছিল তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, “অসংখ্য চ্যালেঞ্জ—কোনটা রেখে কোনটা বলব! এখনও প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ ও নেতিবাচকতা জয় করেই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আস্তে আস্তে এখন প্রায় অনেককেই বোঝাতে সক্ষম হয়েছি যে উপস্থাপনা করেও সফল হওয়া যায়, টাকা আয় করা যায় ও সম্মানিত হওয়া যায়।”
দেশে উপস্থাপনাকে প্রতিষ্ঠিত পেশা হিসেবে গড়ে তোলার পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি বলে মনে করেন আরিফুল। তাঁর অভিযোগ, অনুষ্ঠান আয়োজনে লাখ লাখ টাকা খরচ করা হলেও পেশাদার উপস্থাপকের জন্য বাজেট রাখতে চান না অনেক আয়োজক। আবার অনেকে বিনা পারিশ্রমিকে কিংবা স্বল্প পারিশ্রমিকে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন। এতে পেশাদার উপস্থাপকদের জন্য উপযুক্ত বাজার তৈরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আরিফুলের ভাষায়, “বাংলাদেশের উপস্থাপনাকে সঠিক মূল্যায়ন করার পরিবেশটাই এখনও তৈরি হয়নি। এমন টালমাটাল একটা বাজারে ক্যারিয়ার গড়ার চেয়ে হিমালয় জয় করা অনেক সহজ। তবুও আমি কিছুটা তৈরি করতে পেরেছি। আল্লাহ চাইলে একটা ভালো পরিবর্তন আনব, ইনশাআল্লাহ।”
প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে থাকেননি আরিফুল। মঞ্চে একের পর এক অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করে নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়িয়েছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫০টি মঞ্চ অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করেছেন তিনি। পাশাপাশি কাজ করছেন বিজ্ঞাপন ও ওভিসিতে (অনলাইন ভিডিও কমার্শিয়াল), ভয়েসওভার, স্ক্রিপ্ট রাইটিং এবং অনুষ্ঠান পরিকল্পনায়। জনসমক্ষে কথা বলা ও উপস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণও দিচ্ছেন।
সম্প্রতি জিটিভির ‘আপন ঠিকানা’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন আরিফুল। মঞ্চের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে টেলিভিশনেও নিজের অবস্থান তৈরি করছেন। তাঁর কাছে উপস্থাপনা কেবল মাইক্রোফোন হাতে কথা বলা নয়, দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরির শিল্প।
তবে দেশের টেলিভিশন কিংবা মঞ্চেই থেমে থাকতে চান না তিনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাভাষীদের কমিউনিটিতে বাংলা ভাষায় অনুষ্ঠান উপস্থাপনার স্বপ্ন দেখেন। এর মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিচয় তুলে ধরতে চান আন্তর্জাতিক পরিসরে।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আরিফুল বলেন, “আমি বাংলাদেশের, বাংলা ভাষার একজন পেশাদার উপস্থাপক। আমার ইচ্ছে, পৃথিবীর যে দেশগুলোতে বাংলাভাষী মানুষ বসবাস করছেন, তাঁদের কমিউনিটিতে বাংলা ভাষায় অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা। কারণ, পৃথিবীতে আমরাই একমাত্র জাতি, যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি।”
বাংলা ভাষার শুদ্ধতা ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়েও সচেতন তিনি। ইংরেজিতে কথা বলতে পারলেও প্রয়োজন ছাড়া বাংলিশ ব্যবহার করতে চান না। আরিফুল বলেন, “আমি বাংলিশ পরিহার করে বাংলা ভাষার সঠিক মান বজায় রেখেই কাজ করছি এবং আজীবন করে যাব, ইনশাআল্লাহ।”
করপোরেট চাকরির নিশ্চয়তা ছেড়ে অনিশ্চিত এক পেশায় পা রাখা আরিফুলের কাছে কেবল ক্যারিয়ার পরিবর্তন নয়, নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার লড়াই। প্রায় ৩৫০টি মঞ্চ অনুষ্ঠান থেকে টেলিভিশনের পর্দা—প্রতিটি অভিজ্ঞতা তাঁকে এগিয়ে নিচ্ছে লক্ষ্যের দিকে। এবার তাঁর স্বপ্ন, দেশের সীমানা পেরিয়ে বাংলা ভাষার উপস্থাপনাকে পৌঁছে দেওয়া বিশ্বমঞ্চে।
মন্তব্য করুন