দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশ ও কিরগিজস্তান। এ লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে।
মঙ্গলবার কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে অনুষ্ঠিত দুই দেশের দ্বিতীয় পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ সভায় (এফওসি) এসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং কিরগিজস্তানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাইরাত তুরসুনকুলভ নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন তাসখন্দে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ড. এম. মনিরুল ইসলাম।
বৈঠক শেষে দুই দেশের ফরেন সার্ভিস একাডেমির মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। পাশাপাশি ২০২৬-২০২৭ সালের জন্য দুই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নেও আরেকটি সমঝোতা স্মারক সই করা হয়। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৩৫তম বার্ষিকী ২০২৭ সালে যৌথভাবে উদযাপনের বিষয়েও সম্মত হয় উভয় পক্ষ।
বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, শিক্ষা ও বৃত্তি, কর্মসংস্থান, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সংস্কৃতি, পর্যটন, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং ভিসা সহজীকরণসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি জাতিসংঘ, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) মতো আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ফোরামে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়সহ উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময়ের বিষয়েও ঐকমত্য হয়। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অব্যবহৃত সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে সহযোগিতাকে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ
বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে বেসরকারি খাতের যোগাযোগ বাড়ানো এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সফর বিনিময়ে উৎসাহ দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও ওষুধশিল্পে বৃহত্তর সহযোগিতা এবং অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের বৃহৎ বাজার, উৎপাদন সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে ব্যবসা ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়। সরকারি পর্যায়ের যোগাযোগের পাশাপাশি সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ও ব্যবসা-টু-ব্যবসা (বি-টু-বি) উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে কিরগিজস্তান।
শিক্ষা ও ক্রীড়া খাতে সহযোগিতা, শিক্ষার্থী ও যুবকদের বিনিময়, পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি তৈরি পোশাক, ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশি দক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মীদের জন্য কিরগিজস্তানে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
কিরগিজ প্রতিনিধিদল দেশটির মেডিকেল কলেজগুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগের কথা তুলে ধরে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও ভর্তি প্রক্রিয়ায় নিয়মিত ও আইনসম্মত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আরও কয়েকটি চুক্তি চূড়ান্ত করার উদ্যোগ
দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও সরকারি পাসপোর্টধারীদের ভিসা অব্যাহতি, কৃষি, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, পর্যটন উন্নয়ন, বিনিয়োগের প্রসার ও সুরক্ষা এবং শিল্প খাতে সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়। এসব চুক্তি দ্রুত চূড়ান্ত করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে উভয় পক্ষ।
এদিকে এফওসি শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম কিরগিজস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঝিনবেক কুলুবায়েভের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় পর্যায়ে সহযোগিতা আরও গভীর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কিরগিজ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথা স্মরণ করেন। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং সুবিধাজনক সময়ে তাঁর বাংলাদেশি প্রতিপক্ষকে কিরগিজস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানান।
বৈঠকে জাতিসংঘ ও ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে পারস্পরিক সমন্বয় ও সমর্থনের বিষয়েও আলোচনা হয়।২০৩১-২০৩২ মেয়াদে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং ২০২৮-২০৩০ মেয়াদে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে বাংলাদেশের প্রার্থিতার বিষয়ে কিরগিজস্তানের সমর্থন চান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ ছাড়া বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়েও দেশটির সহযোগিতা চাওয়া হয়।
অন্যদিকে, ২০২৭-২০২৮ মেয়াদে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদে কিরগিজস্তানের প্রার্থিতায় বাংলাদেশের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
দ্বিতীয় এ পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ সভা দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাস্তবমুখী উদ্যোগ গ্রহণে কার্যকর ভিত্তি তৈরি করবে বলে আশা প্রকাশ করেছে উভয় প্রতিনিধিদল। পাশাপাশি পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে ঢাকায় তৃতীয় পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ সভা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন