Advertisement
রবিবার, 11 অক্টোবর 2026
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ

একসময় পর্যটকের ঢল, এখন মধুটিলায় খরা

একসময় পর্যটকের ঢল, এখন মধুটিলায় খরা
News Banner

একসময় পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে শেরপুরের মধুটিলা ইকোপার্কে ছুটে আসতেন দূর-দূরান্তের পর্যটকরা। পাহাড়ি পরিবেশ, কৃত্রিম লেক, ওয়াচ টাওয়ার, মিনি চিড়িয়াখানা ও স্টার ব্রিজ ঘিরে জমজমাট থাকত বিনোদনকেন্দ্রটি। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। দীর্ঘদিন উন্নয়ন ও সংস্কারের অভাব, বিভিন্ন স্থাপনার জরাজীর্ণ অবস্থা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রবেশমূল্য বৃদ্ধিতে পর্যটকদের আগ্রহ কমছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, দুই যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পার্কটিতে নতুন আকর্ষণ যোগ হয়নি। পুরোনো স্থাপনাগুলোও হারিয়েছে সৌন্দর্য। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যটনকেন্দ্রটি ক্রমেই আকর্ষণ হারাচ্ছে।

ভাঙাচোরা স্থাপনা, নষ্ট বোট

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নে ময়মনসিংহ বন বিভাগের ব্যবস্থাপনায় ২০০০ সালে গড়ে তোলা হয় মধুটিলা ইকোপার্ক। পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এটি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন ও সংস্কারের অভাবে পার্কটির বিভিন্ন স্থাপনা এখন বেহাল।

পার্কে থাকা কৃত্রিম লেকের অধিকাংশ পেডেল বোট নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। একসময় দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ স্টার ব্রিজের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে, উঠে গেছে টাইলস। প্রাণীর ভাস্কর্যগুলোর রং উঠে সেগুলোও বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। সীমানাপ্রাচীরের বিভিন্ন অংশ ভাঙা। সম্প্রতি বন্যহাতি পার্কের ভেতরে ঢুকে একটি স্টিলের ছাতাও ভেঙে ফেলেছে।

পার্কে ওয়াচ টাওয়ার থাকলেও সেখানে যাওয়ার সড়কের উন্নয়ন না হওয়ায় দর্শনার্থীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এ ছাড়া মহুয়া রেস্ট হাউস, শিশুপার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনায় নেই আগের সেই আকর্ষণ। নতুন রাইড ও বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকায় পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা অনেক দর্শনার্থীই হতাশ হচ্ছেন।

প্রবেশমূল্য বেড়ে ১০০ টাকা

পর্যটক কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে প্রবেশমূল্য বৃদ্ধির কথা বলছেন পার্ককেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, ২০২৪ সালে জনপ্রতি প্রবেশমূল্য ছিল ২০ টাকা। পরে কয়েক দফায় বাড়িয়ে তা ১০০ টাকা করা হয়েছে। অথচ সেই তুলনায় বাড়েনি পার্কের সুযোগ-সুবিধা।

ব্যবসায়ীদের মতে, প্রবেশমূল্য ৫০ টাকার মধ্যে রাখা গেলে দর্শনার্থীদের আগ্রহ বাড়তে পারে। পর্যটক কমে যাওয়ায় পার্ককেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

শেরপুরের পর্যটন শিল্পের ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজ করা শামীম ইসলাম বলেন, নানা কারণে পর্যটকরা এখানে এসে আগের মতো আনন্দ পাচ্ছেন না। ফলে একবার ঘুরে যাওয়ার পর অনেকেই দ্বিতীয়বার আসতে চান না। এমনকি অন্যদেরও আসতে নিরুৎসাহিত করেন।

নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ

পার্কটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয়দের। সীমানাপ্রাচীরের বিভিন্ন অংশ ভেঙে থাকায় নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের। এ সুযোগে পার্ক ও আশপাশের এলাকায় ছিনতাইকারী, জুয়াড়ি এবং মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জেলার পর্যটন নিয়ে কাজ করা ‘শেরপুর ট্যুরিজম’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাঈদ আহমেদ বলেন, ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি কলেজছাত্র আব্দুর রাজ্জাক হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই নিরাপত্তার শঙ্কায় অনেকে মধুটিলা ইকোপার্কে আসতে চান না। যারা আসেন, তাঁদেরও কেউ কেউ জুয়া, মাদক সেবন ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাবে স্বাভাবিকভাবে ঘোরাফেরা করতে পারেন না।

সাঈদ আহমেদ আরও বলেন, দুই যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পার্কটিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন বা উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। একসময় দূর-দূরান্তের পর্যটকরা এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতেন। এখন সেই আকর্ষণ হারিয়ে যাওয়ায় দর্শনার্থীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

ময়মনসিংহ থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক শাহরিয়ার মুক্তাদির বলেন, যে আশা নিয়ে তিনি পার্কে এসেছিলেন, তার প্রতিফলন দেখতে পাননি। তাঁর চোখে জুয়া খেলার আসর ও মাদক সেবনের চিত্র পড়েছে। নিরাপত্তা নিয়েও যথেষ্ট উদ্বেগ রয়েছে।

শাহরিয়ার মুক্তাদির বলেন, ‘পরবর্তীতে এখানে আর আসব না। তবে ঝুলন্ত ব্রিজসহ নতুন নতুন রাইড স্থাপন করা হলে এবং সুন্দর ব্যবস্থাপনায় পার্কটি পরিচালিত হলে দর্শনার্থী বাড়তে পারে।’

ব্যবস্থাপনায় বন বিভাগের বাড়তি চাপ

পার্ক পরিচালনার দায়িত্ব দিতে বন বিভাগের পক্ষ থেকে দরপত্র আহ্বান করা হলেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, সরকারি নির্ধারিত মূল্যে দরপত্র সম্পন্ন না হওয়ায় দুই দফা উদ্যোগেও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। ফলে বন বিভাগের নিজস্ব জনবল দিয়েই পার্ক পরিচালনা করতে হচ্ছে।

জনবলসংকটের কারণে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা ও দর্শনার্থীদের সেবা দিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে। এতে পার্কের ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আদায় নিয়েও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

ময়মনসিংহ অঞ্চলের মধুটিলা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, সরকারি নির্ধারিত মূল্যে দরপত্র সম্পন্ন হয়নি। তাই নিজস্ব জনবল দিয়েই পার্কের ব্যবস্থাপনা করতে হচ্ছে। জনবল সীমিত থাকায় দায়িত্ব পালনে চাপ তৈরি হচ্ছে।

উন্নয়নের আশ্বাস সংসদ সদস্যের

মধুটিলা ইকোপার্কের উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছেন শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ফাহিম চৌধুরী। তিনি বলেন, তাঁর মরহুম বাবা আলহাজ জাহেদ আলী চৌধুরীর সময়ে পার্কটির উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছিল। এরপর উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন না হওয়ায় পার্কটির বর্তমান অবস্থা তৈরি হয়েছে।

ইঞ্জিনিয়ার ফাহিম চৌধুরী বলেন, ‘আমি এই পার্কের উন্নয়নমূলক কাজ করব, যাতে আবার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। এখানে নতুন নতুন রাইড স্থাপন করা হবে, যাতে দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের পদভারে আবার মুখরিত হয়ে ওঠে মধুটিলা ইকোপার্ক।’

নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত শীত মৌসুমে একসময় মধুটিলা ইকোপার্কে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় থাকত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যাশা, পরিকল্পিত উন্নয়ন, পুরোনো স্থাপনার সংস্কার, নিরাপত্তা জোরদার এবং দর্শনার্থীবান্ধব প্রবেশমূল্য নিশ্চিত করা গেলে আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে সম্ভাবনাময় এই পর্যটনকেন্দ্র।

এই সংবাদটি পঠিত হয়েছে: 13 বার

নিউজ ডেস্ক

স্টাফ রিপোর্টার

এই সাংবাদিকের মোট খবর: 391 টি

মন্তব্য করুন